বর্তমান যুগে হৃদরোগের চিকিৎসায় হার্টের রিং (স্টেন্ট) ব্যবহার একটি সাধারণ প্রক্রিয়া হয়ে উঠেছে। হৃদযন্ত্রের আর্টারি ব্লক হলে হার্টের রিং বসিয়ে সেগুলোর রক্তপ্রবাহ সচল করা হয়। এ প্রবন্ধে আমরা হার্টের রিং এর প্রকার, মূল্য তালিকা, সুবিধা ও অসুবিধা, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং এর যত্নসহ যাবতীয় বিষয় আলোচনা করব। এটি আপনাকে বুঝতে সাহায্য করবে কিভাবে হার্টের রিং কাজ করে এবং কেন এটি প্রয়োজনীয় হতে পারে। হার্টের রিং পরানো কি সঠিক নাকি ভুল এটা সম্পর্কে আমরা প্রবন্ধের শেষে আলোচনা করবো।
হার্টের রিং কী এবং কেন প্রয়োজন?
হার্টের রিং, যা স্টেন্ট নামে পরিচিত, একটি ছোট ধাতব জাল যার মাধ্যমে ব্লক হয়ে যাওয়া হৃদযন্ত্রের ধমনীকে খুলে রক্তপ্রবাহ পুনঃস্থাপন করা হয়। এটি বিশেষ করে সেইসব রোগীদের জন্য ব্যবহার করা হয়, যাদের হৃদযন্ত্রের ধমনীতে জমাট বাঁধা বা ব্লকেজ রয়েছে। এই ব্লকেজের কারণে হৃদপিণ্ডে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়, যার ফলে হৃদরোগ হতে পারে। স্টেন্ট লাগানোর মাধ্যমে ব্লকেজ দূর করে হৃদরোগের ঝুঁকি কমানো হয়। এটি অত্যন্ত কার্যকর একটি পদ্ধতি, যা হৃদরোগের চিকিৎসায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। ব্লকেজ হওয়া ধমনীগুলো পুনরায় খোলার মাধ্যমে হৃদপিণ্ডের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা হয় এবং রোগীর জীবনমান উন্নত হয়।
আরও পড়ুনঃ ভবিষ্যতের জলবায়ু পরিবর্তন: আমরা কি প্রস্তুত?
হার্টের রিং এর ছবি এবং দেখতে কেমন?
হার্টের রিং সাধারণত স্টেইনলেস স্টিল বা কোবাল্ট-ক্রোমিয়াম দিয়ে তৈরি হয়। এটি দেখতে একটি ছোট নলাকার জালের মতো, যা ধমনীতে ঢোকানোর পর প্রসারিত করে আর্টারি খুলে দেয়। এই রিং বসানোর ফলে ধমনীতে ব্লক হয়ে থাকা রক্তপ্রবাহ পুনরায় সচল হয়। হার্টের রিং বিভিন্ন প্রকারের হতে পারে, যেমন মেটাল স্টেন্ট এবং ড্রাগ এলুটিং স্টেন্ট।
ড্রাগ এলুটিং স্টেন্টে এমন ওষুধ থাকে যা ধমনীতে পুনরায় ব্লকেজ হতে বাধা দেয়। প্রতিটি স্টেন্টের নিজস্ব গঠন এবং প্রক্রিয়া রয়েছে, যা রোগীর ধমনী ব্লকেজের ধরণ এবং অন্যান্য চিকিৎসার প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করা হয়। স্টেন্টের ছবির মাধ্যমে এর গঠন এবং কাজ করার পদ্ধতি সহজে বোঝা যায়।
হার্টের রিং পরানোর খরচ
হার্টের রিং পরানোর খরচ বিভিন্ন কারণে পরিবর্তিত হতে পারে। স্টেন্টের প্রকার, হাসপাতালের মান এবং চিকিৎসকদের ফি-এর উপর নির্ভর করে এর খরচ বাড়তে বা কমতে পারে। সাধারণত বাংলাদেশে হার্টের রিং পরানোর খরচ ১ লক্ষ থেকে ৫ লক্ষ টাকার মধ্যে হতে পারে। ২০২৪ সালে এই খরচ কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে, তাই সর্বশেষ মূল্য তালিকা জানতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করা উচিত। চিকিৎসার খরচের মধ্যে স্টেন্টের প্রকারভেদে পরিবর্তন আসতে পারে, যেমন ড্রাগ এলুটিং স্টেন্টের খরচ সাধারণত মেটাল স্টেন্টের তুলনায় বেশি হয়। এছাড়া হাসপাতালে ভর্তি থাকা, অপারেশনের পরবর্তী যত্ন এবং ওষুধের খরচও সামগ্রিক খরচে প্রভাব ফেলে।
হার্টের রিং কিভাবে পড়ানো হয়
হার্টের রিং পরানোর প্রক্রিয়াটি একটি আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি। প্রথমে, চিকিৎসক একটি ক্যাথেটার ধমনীতে ঢোকান, যা একটি ছোট টিউবের মতো। ক্যাথেটার দিয়ে ধমনীতে একটি বেলুন পাঠানো হয়, যা ব্লক হওয়া স্থানে পৌঁছে ফুলিয়ে ব্লক খুলে দেয়। তারপর সেই স্থানে একটি স্টেন্ট বা হার্টের রিং স্থাপন করা হয়। রিংটি ব্লকের স্থানে স্থায়ীভাবে বসে থাকে এবং ধমনীর রক্তপ্রবাহ সচল রাখতে সাহায্য করে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি এঞ্জিওপ্লাস্টি নামে পরিচিত। প্রক্রিয়াটি সাধারণত স্থানীয় অ্যানেস্থেসিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয় এবং রোগীকে দীর্ঘ সময় হাসপাতালে থাকতে হয় না। সফলভাবে স্টেন্ট বসানোর পর ধমনী পুনরায় খুলে যায় এবং রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক হয়, যার ফলে রোগীর হৃদরোগের লক্ষণগুলো কমে যায়।
আরও পড়ুনঃ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের উপায়
হার্টের রিং এর মেয়াদ এবং যত্ন
হার্টের রিং পরানোর পর তা সাধারণত দীর্ঘ মেয়াদ ধরে কার্যকর থাকে। তবে এর মেয়াদ নির্ভর করে রোগীর স্বাস্থ্যের অবস্থা, জীবনধারা এবং অন্যান্য কারণের উপর। স্টেন্ট পরানোর পর রিংটির যত্ন নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা, ধূমপান থেকে বিরত থাকা, এবং ওষুধ সঠিকভাবে গ্রহণ করা রোগীর জন্য অত্যন্ত জরুরি। সঠিক যত্নের মাধ্যমে হার্টের রিং অনেক বছর কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে। স্টেন্ট পরানোর পর ধমনীতে পুনরায় ব্লকেজ হতে পারে, যা প্রতিরোধের জন্য নিয়মিত ওষুধ এবং স্বাস্থ্যকর জীবনধারা মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষা এবং ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করে চললে স্টেন্টের কার্যকারিতা বজায় থাকে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হয়।
হার্টের রিং বসানো : সুবিধা ও অসুবিধা
সুবিধা
- রক্তপ্রবাহ পুনরুদ্ধার: হার্টের রিং ব্লকেজ সরিয়ে ধমনীতে রক্তপ্রবাহ পুনরুদ্ধার করে, যা হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। এটি রক্তপ্রবাহ সচল করার মাধ্যমে হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা পুনঃস্থাপন করতে সহায়ক।
- হৃদরোগের লক্ষণ হ্রাস: হার্টের রিং পরানোর ফলে বুকে ব্যথা বা এনজাইনা জাতীয় লক্ষণ হ্রাস পায়। এতে রোগীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরতে সাহায্য হয়।
- প্রকৃতির চেয়ে কম ঝুঁকি: হার্ট বাইপাস অপারেশনের তুলনায় স্টেন্ট পরানোর প্রক্রিয়াটি কম জটিল এবং ঝুঁকি কম। এটি কম সময়ে সম্পন্ন হয় এবং রোগীকে তুলনামূলক কম সময় হাসপাতালে থাকতে হয়।
অসুবিধা
- পুনরায় ব্লক হওয়ার সম্ভাবনা: কিছু ক্ষেত্রে হার্টের রিং পরানোর পর ধমনীতে পুনরায় ব্লকেজ হতে পারে। তবে ড্রাগ এলুটিং স্টেন্টের ব্যবহার এই ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
- পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: কিছু রোগীর ক্ষেত্রে স্টেন্ট পরানোর পর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে, যেমন রক্তপাত, সংক্রমণ, বা এলার্জি প্রতিক্রিয়া। এছাড়া রিং পরানোর স্থানে ব্যথা বা অস্বস্তি অনুভব করা যেতে পারে, যা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব।
হার্টের রিং এর বিকল্প এবং হার্ট বাইপাসের তুলনা
হার্টের রিং পরানোর বিকল্প হিসেবে হার্ট বাইপাস সার্জারি একটি প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতি। বাইপাস সার্জারিতে হৃদযন্ত্রের ব্লকেজ পাশ কাটানোর জন্য একটি নতুন পথ তৈরি করা হয়। বাইপাসের তুলনায় স্টেন্ট পরানোর প্রক্রিয়াটি কম সময় সাপেক্ষ এবং রোগীর শরীরে কম প্রভাব ফেলে। তবে কোনটি রোগীর জন্য উপযুক্ত হবে তা নির্ভর করে রোগীর ধমনী ব্লকেজের মাত্রা এবং স্বাস্থ্যের উপর। বাইপাস সার্জারি সাধারণত বড় ধমনী ব্লকেজের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় এবং এটি দীর্ঘস্থায়ী সমাধান হতে পারে। অন্যদিকে, স্টেন্ট পরানোর প্রক্রিয়া কম আক্রমণাত্মক এবং ছোট বা মাঝারি ব্লকেজের ক্ষেত্রে কার্যকর। রোগীর জন্য কোন পদ্ধতি উপযুক্ত হবে তা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত।
হার্টের রিং এর সফলতার হার এবং জীবনধারা
হার্টের রিং পরানোর সফলতার হার সাধারণত বেশ ভালো। অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগীরা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে সক্ষম হন এবং তাদের হৃদরোগের লক্ষণগুলো কমে যায়। তবে সফলতার হার বাড়াতে জীবনধারায় পরিবর্তন আনা জরুরি। স্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ, নিয়মিত ব্যায়াম করা, এবং মানসিক চাপ কমানো এই সব কিছু রোগীর সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। স্টেন্ট পরানোর পর জীবনধারায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনলে হার্টের রিং দীর্ঘ সময় কার্যকর থাকে। ধূমপান থেকে বিরত থাকা, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া নিয়মিত ব্যায়াম এবং মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া রোগীর সুস্থতার জন্য সহায়ক। জীবনধারায় পরিবর্তন আনতে পারলে স্টেন্টের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায় এবং রোগীর হার্টের স্বাস্থ্য ভালো থাকে।
হার্টের রিং পরানোর পর করণীয়
হার্টের রিং পরানোর পর রোগীর জন্য কিছু বিশেষ নির্দেশনা মেনে চলা প্রয়োজন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করা, রক্তচাপ এবং কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা, এবং হার্টের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় স্বাস্থ্যকর জীবনধারা অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি। রিং পরানোর পর নিয়মিত হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা এবং চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত। এতে ব্লক হওয়ার ঝুঁকি কম থাকে এবং রোগী সুস্থ জীবনযাপন করতে পারেন। ধূমপান এবং মদ্যপান থেকে বিরত থাকা, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া এবং নিয়মিত ব্যায়াম করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া মানসিক চাপ কমানো এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া রোগীর সুস্থতার জন্য সহায়ক। চিকিৎসকের নিয়মিত পরামর্শ অনুযায়ী চললে রোগীর সুস্থতার হার বাড়ে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমে।
হার্টের রিং এর পরামর্শ
হার্টের রিং পরানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রিং পরানোর পর সঠিকভাবে যত্ন নেওয়া এবং চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে চলা রোগীর সুস্থতার জন্য অপরিহার্য। স্টেন্ট পরানোর পর জীবনধারায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষা করাতে হবে। রোগীর জীবনধারায় স্বাস্থ্যকর পরিবর্তন আনলে হৃদরোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী সঠিকভাবে ওষুধ গ্রহণ করা এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা স্টেন্টের কার্যকারিতা বাড়ায় এবং রোগীর সুস্থতা নিশ্চিত করে।
হার্টের রিং পরানো কি সঠিক নাকি ভুল
হার্টের রিং পরানোর মাধ্যমে হৃদরোগের ঝুঁকি কমানো যায় এবং জীবনধারায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা যায়। স্টেন্টের সঠিক যত্ন এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে এটি দীর্ঘ সময় কার্যকর রাখা সম্ভব। রিং পরানোর পর জীবনধারায় পরিবর্তন আনতে পারলে রোগীর হৃদরোগের ঝুঁকি কমানো এবং সুস্থ জীবনযাপন করা সম্ভব। তাই স্টেন্ট পরানোর পর চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে চলা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনধারা অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বজায় রাখতে স্টেন্ট অত্যন্ত কার্যকর একটি চিকিৎসা পদ্ধতি।
স্টেন্ট পরানো উচিত হবে কি হবে না, তা পুরোপুরি নির্ভর করে রোগীর শারীরিক অবস্থা এবং চিকিৎসকের পরামর্শের উপর। যদি রোগীর ধমনীতে মারাত্মক ব্লকেজ থাকে এবং জীবন ঝুঁকিতে পড়ে, তবে স্টেন্ট পরানো একটি কার্যকরী উপায় হতে পারে। তবে, যদি ব্লকেজ কম হয়, তখন ঔষধ এবং জীবনধারণের পরিবর্তন করেও তা সামলানো সম্ভব হতে পারে। তাই এটা সম্পূর্ণ আপনার শারীরিক অবস্থার উপর নির্ভর করবে।