সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিক্স: কি কেন ও কিভাবে?

বর্তমান যুগ প্রযুক্তিনির্ভর, আর এই প্রযুক্তির মেরুদণ্ড হল সেমিকন্ডাক্টর। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত স্মার্টফোন, কম্পিউটার, টেলিভিশন থেকে শুরু করে আধুনিক চিকিৎসা যন্ত্র, স্বয়ংক্রিয় যানবাহন, এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মহাকাশ গবেষণাতেও সেমিকন্ডাক্টরের ভূমিকা অপরিসীম। ৫জি নেটওয়ার্ক, ইন্টারনেট অব থিংস (IoT) এবং নবায়নযোগ্য শক্তির উন্নয়নে এটি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তির প্রতিটি অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে সেমিকন্ডাক্টর আধুনিক বিশ্বকে এগিয়ে নিচ্ছে, যা আমাদের জীবনকে সহজ, দ্রুত এবং কার্যকর করে তুলেছে।

আধুনিক ইলেকট্রনিক্সে সেমিকন্ডাক্টরের ব্যবহার অপরিসীম। কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, টেলিভিশন, রেডিও, ক্যামেরা ইত্যাদি প্রায় প্রতিটি ইলেকট্রনিক ডিভাইসে সেমিকন্ডাক্টরের ভূমিকা রয়েছে। ট্রানজিস্টর, ডায়োড, ইনটিগ্রেটেড সার্কিট (IC) এসব ডিভাইসের মূল উপাদান হিসেবে সেমিকন্ডাক্টর ব্যবহৃত হয়।

সেমিকন্ডাক্টর কি?

সেমিকন্ডাক্টর এমন এক ধরনের উপাদান যা নির্দিষ্ট শর্তে বিদ্যুৎ পরিবাহিতা প্রদর্শন করে। পরিবাহী এবং নিরোধকের মধ্যবর্তী এই বৈশিষ্ট্যের জন্য, সেমিকন্ডাক্টর ইলেকট্রনিক ডিভাইসের একটি অপরিহার্য উপাদান হিসেবে বিবেচিত। সহজ কথায় বলতে গেলে, সেমিকন্ডাক্টর এমন এক ধরনের বস্তু যা কিছুটা ভালো পরিবাহী হলেও, পুরোপুরি পরিবাহী বা সম্পূর্ণ নিরোধক নয়।

সেমিকন্ডাক্টর এর বৈশিষ্ট্য

সেমিকন্ডাক্টরে বিদ্যুৎ পরিবাহিতায় একটি নির্দিষ্ট মাত্রা থাকে যা পরিবেশ, তাপমাত্রা এবং প্রয়োগকৃত ভোল্টেজের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে। এই উপাদানগুলোর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল – তাদের মধ্যে বিদ্যুৎ পরিবাহিতার একটি শক্ত ব্যান্ড গ্যাপ থাকে। ব্যান্ড গ্যাপ মানে হচ্ছে, ইলেকট্রনের জন্য যা যথেষ্ট শক্তি প্রদান করলে তারা ভ্যালেন্স ব্যান্ড থেকে কনডাকশন ব্যান্ডে চলে যেতে পারে। যখন এই শক্তি পাওয়া যায়, তখন সেমিকন্ডাক্টরগুলোতে বিদ্যুৎ প্রবাহ শুরু হয়।

সেমিকন্ডাক্টর কত প্রকার ও কি কি?

সাধারণভাবে সেমিকন্ডাক্টর দুটি ভাগে ভাগ করা হয় – অন্তর্নিহিত (Intrinsic) এবং বহিরাগত (Extrinsic) সেমিকন্ডাক্টর।

১। অন্তর্নিহিত সেমিকন্ডাক্টর:
এগুলো সাধারণত বিশুদ্ধ উপাদান, যেমন সিলিকন বা জার্মেনিয়াম, যেখানে কোনো অতিরিক্ত অমিশ্রণ বা ডোপিং করা হয় না। এই ধরণের সেমিকন্ডাক্টরে বিদ্যুৎ পরিবাহিতা খুবই সীমিত থাকে, কারণ কোনো অতিরিক্ত ইলেকট্রন বা হোল (ইলেকট্রনের অভাব) নেই। তাপমাত্রা বাড়লে বা আলো পড়লে কিছু ইলেকট্রন কনডাকশন ব্যান্ডে চলে যেতে পারে, কিন্তু সাধারণত এদের পরিবাহিতা খুব কম।

২। বহিরাগত সেমিকন্ডাক্টর:
এই সেমিকন্ডাক্টরে অল্প পরিমাণে অন্য উপাদান যোগ করা হয় (ডোপিং), যার ফলে ইলেকট্রন বা হোলের সংখ্যা বাড়ে এবং বিদ্যুৎ পরিবাহিতা বৃদ্ধি পায়। বহিরাগত সেমিকন্ডাক্টর আবার দুই ধরনের হয় –
 ক) n-type সেমিকন্ডাক্টর: n-type সেমিকন্ডাক্টর হল এক ধরনের অর্ধপরিবাহী উপাদান, যেখানে বাহক হিসেবে ইলেকট্রন প্রধান ভূমিকা পালন করে। এটি মূলত বিশুদ্ধ সেমিকন্ডাক্টরে কিছু নির্দিষ্ট উপাদান যুক্ত করে তৈরি করা হয়, যার ফলে এর বিদ্যুৎ পরিবাহিতা বৃদ্ধি পায়।
 খ) p-type সেমিকন্ডাক্টর: এখানে এমন উপাদান ডোপ করা হয় যার কারণে ইলেকট্রনের অভাব হয় এবং হোল (ইলেকট্রনের অভাব থেকে সৃষ্ট ধরণের পজিটিভ চার্জ বহনকারী কণিকা) তৈরি হয়। হোলগুলো পরিবাহিতা বৃদ্ধি করে।

উপাদানের দিক থেকে, সেমিকন্ডাক্টর বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। সবচেয়ে প্রচলিত উপাদান হল সিলিকন, যা ইলেকট্রনিক্স শিল্পে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও জার্মেনিয়াম, গ্যালিয়াম-আর্সেনাইড (GaAs) ইত্যাদি উপাদানও ব্যবহার করা হয়। উপাদানের ধরনের উপর ভিত্তি করে সেমিকন্ডাক্টরের বৈশিষ্ট্য এবং প্রয়োগ ক্ষেত্রও পরিবর্তিত হয়।

সেমিকন্ডাক্টর এর ব্যবহার

প্রথমেই বলা যায় যে, ইলেকট্রনিক ডিভাইসের সকল মূল উপাদান যেমন ট্রানজিস্টর, ডায়োড, সেন্সর, ইনটিগ্রেটেড সার্কিট (IC) ইত্যাদি তৈরি হয় সেমিকন্ডাক্টরের উপর ভিত্তি করে।

ট্রানজিস্টর:
ট্রানজিস্টর হলো এমন একটি ডিভাইস যা সিগন্যাল এবং পাওয়ারকে নিয়ন্ত্রণ করে। সেমিকন্ডাক্টর দিয়ে তৈরি ট্রানজিস্টরগুলি বর্তমান যুগের কম্পিউটার, মোবাইল ফোন এবং অন্যান্য ইলেকট্রনিক ডিভাইসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ডায়োড:
ডায়োড হলো একমুখী বৈদ্যুতিক প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের ডিভাইস। সেমিকন্ডাক্টর ডায়োড বিদ্যুৎ প্রবাহকে একটি নির্দিষ্ট দিক থেকে অন্য দিকে যেতে সাহায্য করে। এটি বিভিন্ন সার্কিটে সুরক্ষা এবং সংকেত সংশোধনে ব্যবহৃত হয়।

ইনটিগ্রেটেড সার্কিট (IC):
আধুনিক কম্পিউটার এবং স্মার্ট ডিভাইসগুলোতে লক্ষ লক্ষ ছোট ছোট ট্রানজিস্টর একত্রে মিলিয়ে একটি ইনটিগ্রেটেড সার্কিট তৈরি করে। এই সার্কিটগুলো সেমিকন্ডাক্টরের উপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়ায়, ইলেকট্রনিক্সের আধুনিক যুগে এদের গুরুত্ব অপরিসীম।

সোলার সেল ও LED:
সেমিকন্ডাক্টর উপাদান ব্যবহার করে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং এলইডি (লাইট এমিটিং ডায়োড) তৈরির কাজ করা হয়। সৌর সেলে, সেমিকন্ডাক্টরের মাধ্যমে সূর্যের আলোকে বৈদ্যুতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করা হয়। LED গুলোতে সেমিকন্ডাক্টরের বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করে আলো উৎপন্ন করা হয় যা বর্তমানে বাড়ি, অফিস, গাড়ি ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিক্স

সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিক্স এই দুটি একে অপরের সাথে সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। আধুনিক ইলেকট্রনিক্সের ভিত্তি হিসেবে সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি কাজ করে। কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, টেলিভিশন, স্মার্ট ডিভাইস এবং আরও অনেক ডিভাইসে ব্যবহার করা হয় সেমিকন্ডাক্টরের মাধ্যমে তৈরি করা সার্কিট এবং চিপ। এক কথায়, আজকের প্রযুক্তির যুগে যেকোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইসের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার জন্য সেমিকন্ডাক্টর উপাদান অপরিহার্য।

সেমিকন্ডাক্টর ভিত্তিক ডিভাইসগুলির কার্যকারিতা তাদের উচ্চ দক্ষতা, ক্ষুদ্রতা, এবং শক্তি সাশ্রয়ের কারণে। এগুলো দ্রুত সিগন্যাল প্রক্রিয়াকরণ, কম তাপ উৎপাদন এবং উচ্চ গতি সম্পন্ন ডেটা প্রসেসিংয়ের জন্য উপযুক্ত। এছাড়াও, সেমিকন্ডাক্টর উপাদানগুলি তাপমাত্রার পরিবর্তনে তাদের বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করে, যা অনেক ধরনের সেন্সর এবং নিয়ন্ত্রণ ডিভাইস তৈরিতে সাহায্য করে। সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিক্সের সম্পর্ক আজকের প্রযুক্তি বিপ্লবের মেরুদণ্ড। প্রতিদিন আমরা যে স্মার্টফোন ব্যবহার করি, কম্পিউটার চালাই, বা এমনকি গাড়ির উন্নত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা উপভোগ করি, তার পেছনে রয়েছে সেমিকন্ডাক্টরের অবদান।

সর্বশেষে, সেমিকন্ডাক্টর এর বৈশিষ্ট্য, প্রকারভেদ, ব্যবহার এবং ইলেকট্রনিক্সে এর অবদান নিয়ে যে আলোচনা করা হলো, তা থেকে স্পষ্ট যে, আধুনিক প্রযুক্তির যে কোনও উন্নয়নের পেছনে সেমিকন্ডাক্টর একটি মূল ভূমিকা পালন করে। সহজ ও সরল ভাষায় বলতে গেলে, সেমিকন্ডাক্টর কি? এটি সেই উপাদান যা আমাদের ডিজিটাল বিশ্বের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে আছে এবং প্রতিদিন আমাদের জীবনকে সহজ, দ্রুত ও উন্নত করে তুলছে। এই প্রক্রিয়ায়, সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিক্সের সম্পর্ক শুধু কারিগরি সফলতা নয়, বরং মানবজীবনের উন্নয়নের এক অদ্ভুত সমন্বয় যা প্রযুক্তিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে।

তিনটি নতুন সুপারকনডাক্টিভিটির উপাদান আবিষ্কার করেছেন বিজ্ঞানীরা

WhatsApp Group Join Now
Telegram Group Join Now
instagram Group Join Now

সাম্প্রতিক খবর

.আরো