১২০টি স্পেসএক্স স্টারলিংক স্যাটেলাইট পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে পুড়ে গেছে

বিগত জানুয়ারি মাসে ইলন মাস্ক এর প্রায় ১২০টি স্পেসএক্স স্টারলিংক স্যাটেলাইট পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে পুড়ে যায়। প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে চারটি স্যাটেলাইট বায়ুমণ্ডলে পুনঃপ্রবেশ করছিল, যা অনেকের কাছেই উজ্জ্বল আলোর ঝলকানি হিসেবে দৃশ্যমান হয়েছিল। তবে বিজ্ঞানীরা এটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, কারণ এই ঘটনাগুলো পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

যখন স্যাটেলাইটগুলো বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে, তখন প্রচণ্ড তাপে পুড়ে গিয়ে ধাতব কণাগুলো অক্সিডাইজড হয়ে যায়। স্টারলিংক স্যাটেলাইটের মতো ছোট লো আর্থ অরবিট (LEO) স্যাটেলাইটগুলোতে প্রচুর পরিমাণে অ্যালুমিনিয়াম থাকে, যা পুড়ে গিয়ে অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইড উৎপন্ন করে। গবেষকরা আশঙ্কা করছেন, এই অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইড কণাগুলো ওজোন স্তরের ক্ষতি করতে পারে।

যখন স্যাটেলাইটগুলো বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে, তখন সেগুলো ঘণ্টায় ২৭,০০০ কিলোমিটার গতিতে চলতে থাকে। এই উচ্চ গতির ফলে বাতাসের সাথে সংঘর্ষে প্রচণ্ড তাপ সৃষ্টি হয়, যা স্যাটেলাইটের বেশিরভাগ অংশকে দ্রুত পুড়িয়ে ফেলে। যদিও অধিকাংশ স্যাটেলাইট সম্পূর্ণভাবে পুড়ে যায় এবং পৃথিবীর পৃষ্ঠে আঘাত হানে না, তবুও এর ফলে উৎপন্ন ক্ষুদ্র ন্যানো-কণাগুলো দীর্ঘ সময় ধরে বায়ুমণ্ডলে ভাসমান থাকে।

অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইড কণাগুলো সাধারণত ৫০ থেকে ৮০ কিলোমিটার উচ্চতায় অবস্থিত মেসোস্ফিয়ারে জমা হয় এবং পরে ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসে। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, যখন এই কণাগুলো ওজোন স্তরে পৌঁছায়, তখন সেগুলো ক্লোরিনের সাথে রাসায়নিক প্রতিক্রিয়ায় অংশ নিয়ে ওজোন ক্ষয়ের কারণ হতে পারে। ১৯৮৭ সালে মন্ট্রিয়ল প্রোটোকল অনুযায়ী সিএফসি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, কারণ এটি ওজোন স্তরের ব্যাপক ক্ষতি করছিল। এখন বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইড কণাগুলোও একই ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে। যদিও এটি সরাসরি ওজোন স্তর ধ্বংস করে না, তবে এটি রাসায়নিক প্রক্রিয়াগুলোকে ত্বরান্বিত করে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিপজ্জনক হতে পারে।

ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার (ESA) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মহাকাশে ২৮,০০০টিরও বেশি বস্তু রয়েছে, যেগুলোর অধিকাংশই পৃথিবীর নিকটবর্তী কক্ষপথে অবস্থান করছে। ২০১৯ সালের মে মাসে প্রথম ৬০টি স্টারলিংক স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের পর থেকে এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৮,০০০ স্টারলিংক স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠানো হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও ১২,০০০ থেকে ৪২,০০০ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা রয়েছে এই কোম্পানিটির। এ ছাড়া আমাজনসহ অন্যান্য কোম্পানিগুলোরও ৩,০০০ থেকে ১৩,০০০ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা রয়েছে।

একটি স্টারলিংক স্যাটেলাইটের ওজন প্রায় ২৫০ কেজি এবং প্রতিটি স্যাটেলাইট পুনঃপ্রবেশের সময় প্রায় ৩০ কেজি অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইড উৎপন্ন করে। ২০২২ সালে, প্রায় ৪১.৭ মেট্রিক টন অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করেছিল, যা প্রাকৃতিক উৎস থেকে আসা অ্যালুমিনিয়ামের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেশি। গবেষকরা অনুমান করছেন, বর্তমান হারে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ চলতে থাকলে প্রতিবছর ৩৬০ মেট্রিক টন অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইড উৎপন্ন হতে পারে, যা প্রাকৃতিক মাত্রার তুলনায় ৬৪৬ শতাংশ বেশি।

এর প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যাবে না, কারণ মেসোস্ফিয়ারে থাকা এই কণাগুলো ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসতে ২০ থেকে ৩০ বছর সময় নিতে পারে। ফলে, আমরা যখন ক্ষতির মাত্রা বুঝতে পারবো, তখন হয়তো ইতিমধ্যে ওজোন স্তরের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়ে যাবে। গবেষকদের মতে, যদি পরিস্থিতির পরিবর্তন না ঘটে, তাহলে প্রতি বছর ওজোন স্তরের ০.০৫ শতাংশ ক্ষতি হতে পারে, যা অ্যান্টার্কটিকার ওজোন স্তরের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করতে পারে।

বিষয়টি নিয়ে এখনো আন্তর্জাতিকভাবে কোনো কঠোর নিয়ন্ত্রণ নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন (FCC) স্যাটেলাইট কনস্টেলেশন অনুমোদন করে, কিন্তু পুনঃপ্রবেশের ফলে সৃষ্ট ক্ষতির বিষয়টি তাদের মূল্যায়নে অন্তর্ভুক্ত থাকে না। জাতিসংঘের কমিটি অন দ্য পিসফুল ইউজেস অব আউটার স্পেস (COPUOS) মহাকাশ টেকসই ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা শুরু করলেও এখনো কার্যকর কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।

এই বিষয়টি সমাধানের জন্য বিজ্ঞানীরা পরামর্শ দিচ্ছেন যে, স্যাটেলাইট প্রস্তুতকারীরা অ্যালুমিনিয়ামের বিকল্প উপাদান ব্যবহার করতে পারে অথবা স্যাটেলাইটগুলোকে উচ্চ কক্ষপথে ‘গ্রেভইয়ার্ড অরবিট’-এ পাঠানো যেতে পারে, যাতে সেগুলো পুনঃপ্রবেশ না করে। তবে এই পদ্ধতিতে অতিরিক্ত জ্বালানির প্রয়োজন হবে এবং এটি দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান করবে না। পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য মহাকাশ সংস্থাগুলো এবং কোম্পানিগুলোকে নতুন প্রযুক্তির দিকে মনোযোগ দিতে হবে। ভবিষ্যতে আরও বেশি গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে এই সমস্যার টেকসই সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। নয়তো পৃথিবী ভবিষ্যতে ভয়ংর পরিস্থিতিতে পরবে।

বিশ্বের প্রথম কাঠের স্যাটেলাইট এর সফল উৎক্ষেপণ

WhatsApp Group Join Now
Telegram Group Join Now
instagram Group Join Now

সাম্প্রতিক খবর

.আরো