সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করেছেন, যেখানে দেখা গেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিজেই নিজের প্রতিলিপি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। চীনের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা একটি পরীক্ষায় দেখিয়েছেন যে, জনপ্রিয় দুটি বড় ভাষা মডেল তাদের নিজস্ব অনুরূপ সংস্করণ তৈরি করতে পেরেছে। এই গবেষণাটি ২০২৪ সালের ৯ ডিসেম্বর arXiv-এ প্রকাশিত হয়েছে। এতে দেখা গেছে, মেটা ও আলিবাবার দুটি এআই মডেল স্বতন্ত্রভাবে নিজেদের প্রতিলিপি তৈরি করেছে। পরীক্ষায় মেটার লামা৩১-৭০বি-ইনস্ট্রাক্ট মডেল ৫০% ক্ষেত্রে সফল হয়েছে, আর আলিবাবার কুয়েন২.৫-৭২বি-ইনস্ট্রাক্ট মডেল ৯০% ক্ষেত্রে সফল হয়েছে। এই গবেষণাটি এখনো পিয়ার-রিভিউ করা হয়নি, তাই অন্য গবেষকদের দ্বারা একই ফলাফল পুনরাবৃত্তি করা সম্ভব কি না, তা নিশ্চিত নয়।
গবেষণায় দুটি বিষয় পরীক্ষা করা হয়েছিল—”শাটডাউন এভয়ডেন্স” এবং “চেইন অব রিপ্লিকেশন”। প্রথম পরীক্ষায় এআই মডেলকে এমনভাবে প্রোগ্রাম করা হয়েছিল যেন এটি বুঝতে পারে কখন এটি বন্ধ করে দেওয়া হবে এবং তার আগেই এটি নিজেকে অনুলিপি করতে পারে। দ্বিতীয় পরীক্ষায়, এআই মডেলকে নিজের প্রতিলিপি তৈরি করতে এবং সেই প্রতিলিপিকে একই কাজ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়, যা একটি অনির্দিষ্ট চক্র তৈরি করে।
গবেষণাটি বাস্তব পরিবেশ অনুকরণ করে করা হয়েছে, যেখানে সাধারণ জিপিইউ-এর সহায়তায় পরীক্ষাগুলো পরিচালিত হয়। এআই মডেলগুলোকে ‘এজেন্ট স্ক্যাফোল্ডিং’ সরবরাহ করা হয়েছিল, যেখানে বিভিন্ন সরঞ্জাম, নির্দেশাবলী এবং চিন্তন মডেল ছিল, যা এআই-কে অপারেটিং সিস্টেমের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সাহায্য করেছিল। এই প্রক্রিয়ায়, এআই প্রথমে নিজের কর্মপদ্ধতি বুঝতে চেষ্টা করে, তারপর ধাপে ধাপে নিজেকে প্রতিলিপি করার পরিকল্পনা তৈরি করে এবং অবশেষে সেটি বাস্তবায়ন করে।
গবেষকদের মতে, পরীক্ষার সময় এআই কিছু অপ্রত্যাশিত আচরণও দেখিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, এটি বিভিন্ন সফটওয়্যার সংঘর্ষ দূর করতে অন্য প্রসেস বন্ধ করে দিয়েছে, হার্ডওয়্যার সমস্যা সমাধানে সিস্টেম রিবুট করেছে এবং দরকারি তথ্য অনুসন্ধানের জন্য সিস্টেম স্ক্যান করেছে। গবেষকদের ভাষায়, “এই ফলাফলগুলো প্রমাণ করে যে বর্তমান এআই সিস্টেমগুলোর ইতোমধ্যে আত্ম-প্রতিলিপি করার ক্ষমতা রয়েছে এবং এটি নিজেদের টিকিয়ে রাখতে এই ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে।”
এই গবেষণার ফলে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ এআই যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তবে এটি ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা “রোগ এআই” বা স্বায়ত্তশাসিত এআই-এর কথা বলছেন, যা মানব স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে।
এআই গবেষণার সাম্প্রতিক প্রবণতাগুলোর মধ্যে “ফ্রন্টিয়ার এআই” একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হয়ে উঠেছে। এটি মূলত সর্বাধুনিক প্রজন্মের এআই প্রযুক্তিকে বোঝায়, যা জেনারেটিভ এআই-এর ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যেমন ওপেনএআই-এর জিপিটি-৪ এবং গুগলের জেমিনির মতো মডেল। গবেষকরা বলেছেন, মেটা ও আলিবাবার এই মডেলগুলো যদিও বাণিজ্যিকভাবে শক্তিশালী নয়, তবে এগুলো এআই উন্নয়নে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এই উদ্বেগের কারণে গবেষকরা আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, এআই যেন অনিয়ন্ত্রিত আত্ম-প্রতিলিপি না করতে পারে, সে বিষয়ে সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
এখনো পর্যন্ত, এই গবেষণার ফলাফল অন্য গবেষকরা পুনরায় পরীক্ষা করেননি। তবে এটি প্রযুক্তি বিশ্বের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ ধরনের গবেষণা ভবিষ্যতে এআই নিয়ন্ত্রণের জন্য নীতিমালা তৈরিতে সাহায্য করবে।
চীনার নতুন মাল্টিমডাল এআই এরনি ৫.০ এই বছরেই প্রকাশ হতে যাচ্ছে