প্যারিসে দুই দিনের জন্য বিশ্ব নেতারা এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিষয়ক এক সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন। এই আলোচনার মূল বিষয় ছিল কিভাবে প্রযুক্তির উদ্ভাবনকে এগিয়ে নেওয়া যায় এবং একইসঙ্গে দায়িত্বশীল এআই উন্নয়নের বিষয়টিও নিশ্চিত করা যায়। এই সম্মেলনের আগে এআই-এর ঝুঁকি নিয়ে বেশি আলোচনা হলেও, এবারের বৈঠকে বিনিয়োগ ও এআই খাতের বিকাশের উপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ‘কারেন্ট এআই’ নামে একটি বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যা জনস্বার্থে এআই প্রকল্পগুলোকে সহায়তা করতে $৪০০ মিলিয়ন ডলারের প্রাথমিক তহবিল প্রদান করবে। এছাড়া, ফ্রান্সের পক্ষ থেকে ১০০ বিলিয়ন ইউরোর বেশি বেসরকারি খাতের এআই বিনিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগগুলো প্রমাণ করছে যে বিশ্বব্যাপী এআই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে দেশগুলো ও কোম্পানিগুলোর প্রতিযোগিতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এই সম্মেলনে এআই প্রযুক্তির বৈশ্বিক রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা হয়েছে। উচ্চপর্যায়ের উপস্থিতির মধ্যে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং চীনের ভাইস প্রিমিয়ার ঝাং গুয়োকিং। এটি বোঝায় যে এআই কেবল একটি প্রযুক্তিগত বিষয় নয়, বরং এটি বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যেও ভূমিকা রাখছে।
সম্মেলনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়, তবে একইসঙ্গে এআই-এর কারণে বিদ্যমান ক্ষমতার পার্থক্য আরও গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কাও প্রকাশ করা হয়। ভারত ও ফ্রান্সের যৌথভাবে এই সম্মেলনের আয়োজন করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এটি দেখায় যে কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও চীন নয়, অন্যান্য দেশগুলোকেও এআই খাতে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা চলছে। এছাড়া, এই সম্মেলন কূটনৈতিক আলোচনার সুযোগও করে দিয়েছে, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হয়েছেন।
এআই-এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিতর্ক সম্মেলনে এআই-এর জন্য প্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ ও নিয়ন্ত্রণের মাত্রা নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। কিছু প্রযুক্তি কোম্পানি ও বিশ্ব নেতারা, বিশেষ করে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ, হালকা বিধিনিষেধের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন, যাতে নতুন উদ্ভাবন বাধাগ্রস্ত না হয়। ওপেনএআই-এর প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানও বলেছেন, উদ্ভাবকদের কাজ করার স্বাধীনতা দেওয়া দরকার।
ম্যাক্রোঁ স্বীকার করেছেন যে এআই-এর জন্য খুব বেশি বা খুব কম বিধিনিষেধ—দুটোই সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। এদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্প্রতি একটি এআই আইন পাস করেছে, যা বিশ্বে প্রথমবারের মতো একটি বিস্তৃত বিধিনিষেধ ব্যবস্থা প্রণয়ন করেছে। তবে, কিছু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এখন এই আইনের শর্তগুলো শিথিল করার জন্য লবিং করছে।
অন্যদিকে, কিছু বিশেষজ্ঞ ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা এআই-এর সামাজিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, এআই মানুষের চাকরির ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে এবং এজন্য কর্মীদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকা জরুরি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের এআই নীতির মধ্যে পার্থক্য উল্লেখ করে তারা সতর্ক করেছেন যে ইতিমধ্যে গৃহীত সুরক্ষামূলক নীতিগুলোকে দুর্বল করা উচিত নয়।
সম্মেলনে আলোচনা হওয়া বিষয়গুলো দেখায় যে এআই এখন শুধু প্রযুক্তিগত উন্নয়নের বিষয় নয়, বরং এটি অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। এআই-এর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বিশ্বনেতারা এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা ক্রমেই বাড়ছে। এখন দেখার বিষয়, এই সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো ভবিষ্যতে এআই খাতে কী ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসে।
নতুন গবেষণায় প্রকাশিত এআই এর ব্যবহার আমাদের চিন্তা শক্তিকে কমিয়ে দিচ্ছে