কার্বন হলো জীবনের মূল উপাদান, আর মহাবিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এ ধরনের জটিল কার্বন অণুর সন্ধান বিজ্ঞানীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাম্প্রতিক গবেষণায় এমআইটি-র গবেষকরা একটি নতুন সন্ধান পেয়েছেন, যেখানে তারা ইন্টারস্টেলার মেঘ বা তারা গঠনের মূল স্তরের মধ্যে এমন ধরনের কার্বন অণু খুঁজে পেয়েছেন, যেগুলি আমাদের সৌরজগতের আগেও টিকে ছিল। এই আবিষ্কারটি মহাবিশ্বে জীবনের উৎস ও ক্রমবিকাশ সম্পর্কে ধারণা পেতে সহায়ক হতে পারে।
এবারে আমরা আলোচনা করবো কীভাবে এই আবিষ্কারটি জীবনের উত্থান এবং এর ব্যাখ্যা সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়া বাড়ায়। এটি একটি অত্যন্ত কঠিন বিষয়, কিন্তু আমরা সহজ ভাষায় বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করবো।
গবেষণার খুঁটিনাটি: গবেষণার সময় যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট ভার্জিনিয়াতে অবস্থিত গ্রিন ব্যাংক টেলিস্কোপ ব্যবহার করা হয়, যেটি অনেক দূরের জায়গাগুলো থেকে রেডিও তরঙ্গ শনাক্ত করতে পারে। এই গবেষণায় তারা টিএমসি-১ নামের একটি শীতল ও অন্ধকার মেঘে ১-সায়ানোপাইরিন নামক একটি অণুর অস্তিত্ব শনাক্ত করেন। এই অণুটি “পাইরিন” নামক আরও একটি অণুর ট্রেসার হিসেবে কাজ করে। পাইরিন কার্বনের দুটি বা তার বেশি রিং সমন্বিত একটি জটিল অণু যা জীবনের মূল ভিত্তি হিসেবে পরিচিত।
আরও পড়ুনঃ জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা পৃথিবীতে আঘাতকারী উল্কাপিন্ডের রহস্যময় উত্স উন্মোচন করেছেন
জীবনের উপাদানের সন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ: পাইরিন খুব সহজে শনাক্ত করা যায় না, তাই বিজ্ঞানীরা সায়ানোপাইরিনের ওপর নির্ভর করেছেন। এই পদার্থটি পাইরিন ও সায়ানাইড মিলে তৈরি হয়, এবং এটি মহাবিশ্বের বিভিন্ন স্থানে পাওয়া যায়। যেহেতু এই অণুর নির্দিষ্ট রেডিও তরঙ্গ নির্গমণ করার ক্ষমতা আছে, তাই রেডিও টেলিস্কোপে এটি শনাক্ত করা সহজ হয়। বিজ্ঞানীরা পেয়েছেন যে, সায়ানোপাইরিনের পরিমাণ দেখে পাইরিনের পরিমাণ অনুমান করা যায়।
এই আবিষ্কারে পাওয়া যায় যে, পাইরিনের মতো জটিল অণু শুধু মাত্র এককভাবে নয় বরং বৃহৎ পরিমাণে এই ধরনের মেঘে অবস্থান করতে পারে, যা তারা ও সৌরজগতের গঠন প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হয়। এছাড়া, এই ধরনের অণু মহাকাশের প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকতে সক্ষম, যা জীবনের উদ্ভবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি ফ্যাক্টর।
পাইরিনের পরিচয় ও এর স্থায়িত্ব: পাইরিন হলো একটি পলিসাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন (PAH), যা কার্বন রিংয়ের সমন্বয়ে তৈরি। এই ধরনের PAH গুলো জীবনের গঠনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এছাড়া, জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা অনেক আগে থেকেই জানেন যে PAH মহাবিশ্বে প্রচুর পরিমাণে আছে এবং এগুলো অনেক কঠিন পরিবেশেও টিকে থাকতে সক্ষম।
গবেষণায় পাইরিন ও সায়ানোপাইরিনের এই অস্তিত্ব প্রমাণ করে যে এই অণুগুলো শুধু তারা গঠনের প্রক্রিয়ায়ই নয়, বরং এরা তারা গঠনের পরে তীব্র রশ্মির আঘাতেও টিকে থাকতে পারে। সুতরাং, এগুলো মহাবিশ্বে প্রথম জীবন গঠনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
মহাবিশ্বে জীবনের সম্ভাবনা ও পাইরিনের প্রভাব: এই আবিষ্কারটি মহাবিশ্বের যেকোনো স্থানে কার্বনভিত্তিক জীবনের সম্ভাবনা বিষয়ে আমাদের নতুন ধারণা দেয়। মহাবিশ্বে অন্যান্য তারাপুঞ্জের মতো আমাদের সৌরজগতের গঠনের মেঘেও এই অণুগুলোর অস্তিত্ব ছিল এবং তারা এই মেঘ থেকে পৃথিবীতে জীবনের সম্ভাবনা তৈরিতে সহায়তা করেছে। এর মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি যে জীবনের উত্থান মহাকাশ থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন কার্বনভিত্তিক অণুর মাধ্যমে ঘটেছে এবং তা পৃথিবীতে প্রাথমিক জীবের প্রভাব ফেলেছে।
এই আবিষ্কারটি আমাদের এই বিষয়টি বুঝতে সাহায্য করে যে, মহাবিশ্বে প্রাণের সম্ভাব্য গঠন কীভাবে বিভিন্ন অণুর মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। একইসাথে, এটি আরো প্রমাণ করে যে মহাবিশ্বের যে কোনো প্রান্তে এ ধরনের কার্বনভিত্তিক জটিল অণুর সন্ধান করা যেতে পারে, যা জীবনের মূল উপাদান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।