চীনের এআই মডেল ডিপসিক আর১ ওপেনএআই এর চ্যাটজিপিটিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে

সাম্প্রতিক সময়ে এআই জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে চীনা কোম্পানি ডিপসিক। ডিপসিক নামক এই প্রতিষ্ঠানটি মাত্র কয়েকদিন আগে পর্যন্ত ছিল অল্প কিছু এআই বিশেষজ্ঞের মধ্যে পরিচিত। এটি চীনের হাই-ফ্লাইয়ার ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের একটি সাবসিডিয়ারি, যা মূলত কোয়ান্টিটেটিভ অ্যানালাইসিসে বিশেষজ্ঞ। কিন্তু তাদের নতুন মডেল ডিপসিক আর১ প্রকাশের পর থেকে এটি সিলিকন ভ্যালির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

ডিপসিক আর১: কীভাবে এটি আলাদা

ডিপসিক আর১ একটি শক্তিশালী লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) যা জটিল সমস্যার সমাধান এবং যুক্তিসম্পন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে। মডেলটি প্রতিটি সমস্যার সমাধানে ধাপে ধাপে চিন্তা করে, যা “চেইন অব থট” পদ্ধতি হিসেবে পরিচিত। এটি ওপেনএআই-এর বর্তমান উন্নত মডেল o1-এর মতোই কার্যক্ষম, তবে উল্লেখযোগ্যভাবে কম খরচে তৈরি। ডিপসিক আর১ তৈরি করতে খরচ হয়েছে মাত্র ৫ মিলিয়ন ডলার, যেখানে অত্যাধুনিক গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিটের (জিপিইউ) ব্যবহার ছিল সীমিত। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত প্রযুক্তিগত বিধিনিষেধের মধ্যেই তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। ডিপসিক আর১-এর আরেকটি বড় সুবিধা হলো এর ওপেন সোর্স হওয়া। যেখানে ওপেনএআই-এর o1 মডেল ব্যবহারের জন্য অর্থ প্রদান করতে হয়, সেখানে ডিপসিক আর১ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ডাউনলোড এবং ব্যবহার করা যায়। এর ফলে এটি হাগিং ফেস প্ল্যাটফর্মে দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে এবং ব্যবহারকারীরা ইতিমধ্যেই মডেলটি বিভিন্ন কাজের জন্য ফাইন-টিউন করে ব্যবহার করছেন।

সহজলভ্যতা এবং খরচ সাশ্রয়

ডিপসিক আর১-এর ওপেন সোর্স হওয়ার কারণে এর ব্যবহার এবং উন্নয়নে বড় ধরনের গতি এসেছে। এটি কেবল বড় বড় প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়, বরং ব্যক্তিগত এবং ছোট প্রতিষ্ঠানের জন্যও সহজলভ্য। ব্যবহারকারীরা এটি মোবাইল ডিভাইসেও চালানোর মতো ছোট সংস্করণে রূপান্তর করেছেন। ডিপসিকের এপিআই ব্যবহার করাও অত্যন্ত সাশ্রয়ী। ওপেনএআই-এর o1 মডেলের তুলনায় এটি প্রায় ৯০ শতাংশ কম খরচে এপিআই সেবা প্রদান করে। এর পাশাপাশি, ডিপসিক একটি ফ্রি ওয়েবসাইট এবং মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য চ্যাটবট পরিষেবা চালু করেছে, যা ওয়েব সার্চের সাথে সংযুক্ত।

আরও পড়ুনঃ চীন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিতে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে যা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন

ওপেনএআই এবং ডিপসিক এর তুলনা

ওপেনএআই প্রতিষ্ঠানের মডেলগুলোর সঙ্গে ডিপসিকের তুলনা করতে গেলে কয়েকটি বড় পার্থক্য দেখা যায়। ওপেনএআই-এর মডেলগুলো মূলত সাবস্ক্রিপশন-ভিত্তিক এবং ব্যয়বহুল। অন্যদিকে, ডিপসিক আর১ সহজলভ্য, সাশ্রয়ী এবং ওপেন সোর্স।

ডিপসিক আর১ এর কিছু উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য:

  • এটি জটিল সমস্যার সমাধানে কম সময় নেয়।
  • এটি ব্যবহারের খরচ অত্যন্ত কম।ব্যবহারকারীরা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী এটি ফাইন-টিউন করতে পারেন।
  • অন্যদিকে, ওপেনএআই-এর মডেলগুলো ধীর, ব্যয়বহুল এবং ব্যবহারকারীর জন্য নিয়ন্ত্রণের সুযোগ সীমিত।

ডিপসিকের ওপেন সোর্স হওয়ার প্রভাব

ডিপসিকের ওপেন সোর্স হওয়ার ফলে প্রযুক্তি জগতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এটি ব্যবহারকারীদের মডেলটি নিজেদের প্রয়োজনমতো পরিবর্তন এবং উন্নত করার সুযোগ দিয়েছে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিজস্ব জিপিইউ ব্যবহার করে ডিপসিকের মডেল চালাতে পারছে, ফলে অতিরিক্ত খরচ এবং ওপেনএআই-এর ওপর নির্ভরতা কমেছে। অনেকে ডিপসিকের এই বিপ্লবকে অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমের উদাহরণের সাথে তুলনা করেছেন। যেমন অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল অপারেটিং সিস্টেমকে সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে নিয়ে এসেছে, তেমনই ডিপসিক আর১ এআই ব্যবহারের সুযোগ উন্মুক্ত করেছে। ডিপসিক আর১-এর সাফল্য চীনের এআই খাতের অগ্রগতির একটি বড় উদাহরণ। সম্প্রতি টিকটকের মূল প্রতিষ্ঠান বাইটড্যান্সও ডাউবাও-১.৫-প্রো নামে একটি মডেল প্রকাশ করেছে, যা ওপেনএআই-এর জিপিটি-4o মডেলের সমান কার্যক্ষম কিন্তু অনেক কম খরচে তৈরি।

যদিও ডিপসিক আর১ প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত উন্নত, তবে এর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। চীনের আইন অনুযায়ী, ডিপসিকের মডেল কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ, তিয়ানানমেন স্কোয়ারের ঘটনার বিষয়ে প্রশ্ন করলে এটি সঠিক উত্তর প্রদান করতে পারে না। এই সীমাবদ্ধতা পশ্চিমা ব্যবহারকারীদের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তবে এটি উল্লেখযোগ্য যে, ওপেনএআই-এর মডেলগুলোও কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে অস্বীকৃতি জানায়। তাই এ ধরনের সীমাবদ্ধতা একপাক্ষিক নয়। ডিপসিকের ওপেন সোর্স হওয়ার কারণে ব্যবহারকারীরা এটি অফলাইনে এবং নিরাপদ পরিবেশে ব্যবহার করতে পারেন।

ডিপসিক আর১ কেবল একটি শুরু। এটি দেখিয়েছে যে, চীনা এআই মডেলগুলো কত দ্রুত উন্নতি করছে এবং কীভাবে তারা সিলিকন ভ্যালির আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। ওপেনএআই এবং অন্যান্য বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখন ডিপসিকের মতো মডেলগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে নিজেদের মডেলগুলোকে আরও উন্নত এবং সাশ্রয়ী করতে হবে।

ডিপসিক আর১-এর সাফল্য প্রমাণ করেছে যে, প্রযুক্তির জগতে প্রতিযোগিতা এবং উদ্ভাবনের কোনো সীমা নেই। এটি কেবল একটি মডেল নয়, বরং এআই-এর ভবিষ্যৎ বিকাশের একটি নতুন অধ্যায়।

ওপেনএআই নতুন ০৩ মডেল এর ঘোষনা করেছে

WhatsApp Group Join Now
Telegram Group Join Now
instagram Group Join Now

সাম্প্রতিক খবর

.আরো