বিজ্ঞানীরা আলো ব্যবহার করে এমন একটি কৌশল আবিষ্কার করেছেন যা দিয়ে জটিল অণুগুলোর গঠন পরিবর্তন করা সম্ভব। এটি শুধুমাত্র তাপগতীয় সাম্যাবস্থা অতিক্রম করেই নয়, বরং একদম নতুন এক রাসায়নিক পদ্ধতির উদ্ভাবনকেই তুলে ধরেছে। এই পদ্ধতি প্রযুক্তি ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে একটি নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে। বোলোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর আলবার্তো ক্রেদি ও তাঁর গবেষণা দল আলো-চালিত প্রতিক্রিয়া এবং স্বয়ং-সংযোজন পদ্ধতি একত্রিত করে অণুর ভেতরে একে অপরকে প্রবেশ করানোর একটি কৌশল আবিষ্কার করেছেন। এটি তাপগতীয় সাম্যাবস্থার সীমা অতিক্রম করে এমন একটি উচ্চ-শক্তির গঠন তৈরি করতে সক্ষম।
আরও পড়ুনঃ সৌরশক্তি ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব উপায়ে হাইড্রোজেন উৎপাদন
প্রফেসর ক্রেদি বলেন “আমরা দেখিয়েছি যে, জলে দ্রবীভূত একটি মিশ্রণে আলো প্রয়োগ করে এটি তাপগতীয় সাম্যাবস্থা পৌঁছাতে বাধা দেওয়া সম্ভব। ফলে, সেই অবস্থায় যে অণুগঠন সাধারণত হয় না, সেটিই প্রধান পণ্য হিসেবে পরিণত হয়,”। এই পদ্ধতি জীবনের রাসায়নিক কার্যক্রম অনুকরণ করার একটি বড় চ্যালেঞ্জ পূরণ করেছে। জীবন্ত সত্তাগুলো তাদের রাসায়নিক প্রক্রিয়াগুলোকে তাপগতীয় সাম্যাবস্থার বাইরে পরিচালনা করে। এ ধরনের প্রক্রিয়ার কৃত্রিম পুনরুত্পাদন অত্যন্ত কঠিন, তবে এটি সম্ভব হলে স্মার্ট ড্রাগস এবং উদ্ভাবনী পদার্থ তৈরি করা সম্ভব হবে।
গবেষণায় ব্যবহৃত দুটি মূল উপাদান হলো সাইক্লোডেক্সট্রিন এবং আজোবেঞ্জিন। সাইক্লোডেক্সট্রিন একটি ফাঁপা, পানিতে দ্রবণীয় অণু যা শঙ্কু আকৃতির। অন্যদিকে, আজোবেঞ্জিন এমন একটি যৌগ যা আলোর প্রভাবে আকার পরিবর্তন করতে পারে। পানিতে এই উপাদানগুলোর মিথস্ক্রিয়া দ্বারা সুপ্রামলিকুলার জটিল গঠন তৈরি হয়, যেখানে সূক্ষ্ম আজোবেঞ্জিন সাইক্লোডেক্সট্রিনের ফাঁপা অংশে প্রবেশ করে।
আলো-নিয়ন্ত্রিত অণুগঠনের ক্ষেত্রে আজোবেঞ্জিন দুটি ভিন্ন প্রান্তে থাকে এবং সাইক্লোডেক্সট্রিনের দুই দিকও আলাদা। তাই আজোবেঞ্জিন সাইক্লোডেক্সট্রিনের ভেতরে প্রবেশ করলে দুটি ভিন্ন জটিল গঠন তৈরি হয়। একটি গঠন বেশি স্থিতিশীল, তবে ধীর গতিতে তৈরি হয়। অন্যটি দ্রুত তৈরি হলেও কম স্থিতিশীল। আলো প্রয়োগ করলে কম স্থিতিশীল জটিল গঠনটি বেশি পরিমাণে তৈরি হয় কারণ এটি তাড়াতাড়ি গঠিত হয়। আলো বন্ধ করলে আবার স্থিতিশীল গঠনটি ধীরে ধীরে ফিরে আসে।
এই পদ্ধতিটি আলোকে রাসায়নিক শক্তি হিসেবে ব্যবহার করে অস্থিতিশীল পণ্য তৈরির মাধ্যমে রাসায়নিক সংশ্লেষণের একটি নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে। এটি থেকে বিভিন্ন উদ্ভাবনী পদার্থ এবং ডিভাইস যেমন ন্যানোমোটর তৈরি সম্ভব হবে, যা তাপগতীয় সাম্যাবস্থার বাইরে কাজ করতে সক্ষম। এ ধরনের উদ্ভাবনী পদ্ধতি প্রযুক্তি এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটাতে পারে। আলো-চালিত প্রতিক্রিয়ার এই পদ্ধতি কেবলমাত্র তাত্ত্বিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়। এটি বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা হলে একাধিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, চিকিৎসা ক্ষেত্রে স্মার্ট ড্রাগ তৈরি, যা বিশেষ ধরনের কোষকে লক্ষ্য করে কাজ করতে পারে। এছাড়াও, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি উদ্ভাবনেও এর ভূমিকা অনস্বীকার্য।
আজোবেঞ্জিন এবং সাইক্লোডেক্সট্রিনের সমন্বয়ে তৈরি এই প্রযুক্তি অত্যন্ত সহজলভ্য এবং টেকসই। এর মাধ্যমে জটিল অণুগঠন সৃষ্টি এবং নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, যা ভবিষ্যতে আরও নতুন আবিষ্কার এবং উদ্ভাবনের পথ দেখাবে। তাপগতীয় সাম্যাবস্থার বাইরে রাসায়নিক প্রক্রিয়াগুলো পরিচালনার এই কৌশল ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
বিজ্ঞানীরা প্রোটনের ভেতরের জটিল সম্পর্কগুলোকে চিত্র আকারে দেখাতে সমর্থ হয়েছেন