ডিপসিক এআই এর কারণে অ্যাপলের বিলিয়ন ডলার বেঁচে গেলো

সাম্প্রতিক সময়ে চীনা এআই স্টার্টআপ ডিপসিক তাদের নতুন R1 রিজনিং মডেল ঘোষণা করেছে, যা এআই জগতে একটি বিশাল পরিবর্তন এনেছে। এই মডেলটি বর্তমান সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী এলএলএমগুলোর (LLM) সমতুল্য বা তার থেকেও উন্নত, কিন্তু এটি তৈরি এবং চালানোর খরচ অন্যান্য কোম্পানী তুলনায় অনেক কম। এর ফলে, এআই প্রযুক্তি আর কেবলমাত্র বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া দখলে থাকছে না। ডিপসিক কেবল তাদের মডেল প্রকাশ করেনি, বরং একটি বিস্তারিত গাইডও প্রকাশ করেছে, যা অন্যদের জন্য এই সাফল্য অনুসরণ করা সহজ করে তুলেছে। এই ঘটনার ফলে সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অ্যাপল অন্যতম।

গত কয়েক বছর ধরে অ্যাপল-কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নয়নে পিছিয়ে পড়া প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হচ্ছিল। বিশেষ করে ওপেনএআই, গুগল, এবং মেটা যখন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে শক্তিশালী এআই তৈরি করছিল, তখন অ্যাপল তুলনামূলকভাবে নীরব ছিল। অনেকে এটিকে তাদের কৌশলগত ব্যর্থতা বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু ডিপসিক-এর এই নতুন উদ্ভাবনের কারণে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, অ্যাপল আসলে একটি সুচিন্তিত পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে এবং এর ফলে তারা বিলিয়ন ডলার বাঁচিয়ে ফেলেছে।

ডিপসিক-এর মডেল ব্যবহার করে অ্যাপল এখন কম খরচে নিজস্ব শক্তিশালী এআই তৈরি করতে পারবে। পূর্বে, অ্যাপল ওপেনএআই-এর সাথে একটি অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছিল, যা অনেক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের বিস্মিত করেছিল। অনেকেই এটি অ্যাপল-এর দুর্বলতার প্রতিফলন হিসেবে দেখেছিলেন। ইলন মাস্ক পর্যন্ত এই অংশীদারিত্বকে সমালোচনা করে বলেছিলেন যে এটি ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তার জন্য হুমকি হতে পারে। কিন্তু ডিপসিক-এর প্রযুক্তি হাতে পাওয়ার পর অ্যাপল-এর আর ওপেনএআই-এর ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই। অ্যাপল চাইলে এই অংশীদারিত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে পারে কিংবা নিজেদের স্বার্থে নতুন শর্তে চুক্তি করতে পারে।

বর্তমান সময়ে বড় ভাষার মডেল (LLM) একমাত্র পার্থক্যকারী শক্তি নয়। বরং, আসল মূল্য রয়েছে ডাটা, ব্যবহারকারীর কনটেক্সট, ইউজার ইন্টারফেস, এবং পরিবেশন প্রক্রিয়ায়। এই দিকগুলোতে অ্যাপল দীর্ঘদিন ধরেই শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। তাদের এক বিশাল ইকোসিস্টেম রয়েছে যেখানে আইফোন, ম্যাকবুক, আইপ্যাডের মতো ডিভাইস ব্যবহারকারীদের জীবনের সাথে গভীরভাবে সংযুক্ত। ডিপসিক-এর প্রযুক্তির সাহায্যে অ্যাপল এখন আরও এগিয়ে যেতে পারবে।

ডিপসিক-এর R1 মডেলটি বিশেষভাবে কম শক্তি ব্যয় করে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রসেসিং করতে সক্ষম। এটি এমন হার্ডওয়্যারে কাজ করতে পারে যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল GPU-এর ওপর নির্ভর করে না। এই বৈশিষ্ট্য অ্যাপল-এর জন্য স্বর্ণ সুযোগ এনে দিয়েছে, কারণ তাদের হার্ডওয়্যার সবসময়ই উচ্চ পারফরম্যান্স ও শক্তি দক্ষতার জন্য জনপ্রিয়। অ্যাপল দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করছিল স্থানীয়ভাবে (on-device) এলএলএম চালানোর উপায় বের করতে। এখন, ডিপসিক-এর উদ্ভাবনের ফলে সেই পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ নিতে চলেছে। এর মানে হলো, ভবিষ্যতে আইফোন ও ম্যাক ডিভাইসগুলো আরও স্মার্ট হবে এবং ব্যবহারকারীদের ডেটা সংরক্ষণ করে আরও শক্তিশালী পারফরম্যান্স প্রদান করবে।

ডিপসিক-এর ঘোষণার পরপরই প্রযুক্তি বাজারে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বিশেষত, এনভিডিয়া-এর মতো কোম্পানিগুলো যারা মূলত উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন GPU তৈরি করে, তাদের জন্য এটি ছিল একটি বড় ধাক্কা। এনভিডিয়া-এর স্টক মূল্য ১৭% হ্রাস পেয়েছে এবং তাদের বাজারমূল্য থেকে ৫৮৯ বিলিয়ন ডলার মুছে গেছে। এর প্রধান কারণ হলো, এলএলএম চালানোর জন্য আর অতিরিক্ত ব্যয়বহুল হার্ডওয়্যার প্রয়োজন পড়বে না।

অপরদিকে, অ্যাপল-এর শেয়ার মূল্যে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি, বরং উল্টো বৃদ্ধি পেয়েছে। বিনিয়োগকারীরা হয়তো একই প্রযুক্তি খাতে নিজেদের বিনিয়োগ স্থানান্তর করেছে অথবা তারা উপলব্ধি করেছে যে, অ্যাপল এই পরিবর্তন থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে পারে। যে কারণেই হোক, প্রযুক্তি জগতে বর্তমানে বেশ উত্তেজনাপূর্ণ সময় চলছে এবং অ্যাপল-এর জন্য এটি আরও ভালো সময় হয়ে উঠছে।

ডিপসিক-এর এই সাফল্য কেবল অ্যাপল-এর জন্যই নয়, বরং পুরো এআই ইন্ডাস্ট্রির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। এখন অনেক ছোট প্রতিষ্ঠানও তুলনামূলক কম বিনিয়োগে নিজেদের শক্তিশালী এআই মডেল তৈরি করতে পারবে। এটি প্রযুক্তি দুনিয়ার ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। বিশেষ করে অ্যাপল-এর মতো প্রতিষ্ঠান যারা গোপনীয়তা, নিরাপত্তা, এবং ইকোসিস্টেমের ওপর জোর দেয়, তাদের জন্য এটি এক বিশাল সুযোগ।

অ্যাপল দীর্ঘদিন ধরেই তাদের ডিভাইসের জন্য এআই-চালিত ফিচার নিয়ে কাজ করছে। ডিপসিক-এর উদ্ভাবন এখন সেই প্রচেষ্টাকে বাস্তবায়নের নতুন দ্বার উন্মুক্ত করেছে। ভবিষ্যতে আমরা দেখতে পাবো অ্যাপল তাদের নিজস্ব কাস্টমাইজড এআই তৈরি করবে, যা তাদের ইকোসিস্টেমের সাথে গভীরভাবে সংযুক্ত থাকবে এবং ব্যবহারকারীদের জন্য আরও উন্নত অভিজ্ঞতা প্রদান করবে। এটি কেবল একটি নতুন প্রযুক্তিগত সাফল্য নয়, বরং প্রযুক্তি খাতে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত।

চীনের এআই মডেল ডিপসিক আর১ ওপেনএআই এর চ্যাটজিপিটিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে

WhatsApp Group Join Now
Telegram Group Join Now
instagram Group Join Now

সাম্প্রতিক খবর

.আরো