বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি হয়ে উঠেছে। এআই-এর সম্ভাব্য প্রভাব ও সুযোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং নীতিমালা তৈরি করতে গুগল একটি বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর লক্ষ্য হলো কর্মীদের প্রশিক্ষণ, সরকারের সাথে সহযোগিতা এবং এআই বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
গুগল বিশ্বাস করে যে এআই প্রযুক্তি সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান বাড়ানো এবং এ প্রযুক্তির ব্যবহারিক দিকগুলো নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া ভবিষ্যতে কার্যকর নীতিমালা তৈরিতে সহায়ক হবে। এই বিষয়ে গুগলের প্রেসিডেন্ট অফ গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স, কেন্ট ওয়াকার বলেছেন, “যখন মানুষ এবং প্রতিষ্ঠান এআই সম্পর্কে সচেতন হয় এবং এটি ব্যবহার করে, তখন সঠিক নীতিমালা গঠন সহজ হয়। এটি একটি ইতিবাচক চক্র।”
আরও পড়ুনঃ চীনের এআই মডেল ডিপসিক আর১ ওপেনএআই এর চ্যাটজিপিটিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে
গুগল কর্মী এবং শিক্ষার্থীদের এআই বিষয়ে দক্ষ করে তোলার জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি চালু করেছে। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো “গ্রো উইথ গুগল।” এই প্রোগ্রামে কর্মীদের তথ্য বিশ্লেষণ এবং আইটি সাপোর্টের মতো প্রযুক্তিগত দক্ষতা শেখানো হয়। ডিসেম্বর পর্যন্ত, প্রায় ১০ লাখ মানুষ এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে সার্টিফিকেট অর্জন করেছেন। গুগল এখন এআই সম্পর্কিত বিশেষ কোর্স চালু করছে, যার মধ্যে শিক্ষকদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কোর্স রয়েছে।
অন্যদিকে, গুগল সম্প্রতি “স্কিলড ট্রেডস অ্যান্ড রেডিনেস” প্রোগ্রাম চালু করেছে। এটি একটি জন-প্রাইভেট পার্টনারশিপ মডেল যেখানে স্থানীয় কলেজের সাথে কাজ করে কর্মীদের এআই সম্পর্কিত জ্ঞান এবং দক্ষতা প্রদান করা হয়। এই কর্মসূচি বিশেষ করে ডেটা সেন্টার নির্মাণের জন্য কর্মী তৈরি করছে।
গুগল এআই শিক্ষায় ১২০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। এর পাশাপাশি, কোম্পানি ডেভিড অটরের মতো বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদদের নিয়োগ দিয়েছে, যারা এআই-এর কর্মক্ষেত্রের উপর প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছেন। অটরের মতে, এআই ব্যবহার করে আরও কার্যকর প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব, যা ক্লাসরুম ট্রেনিং থেকে অনেক বেশি ফলপ্রসূ হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে তিনি ফ্লাইট সিমুলেটরের মতো ইমার্সিভ ট্রেনিং মডেলের কথা উল্লেখ করেছেন।
গুগল এআই বিষয়ে আন্তর্জাতিক নীতিমালা গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রস্তাবিত এআই আইন নিয়ে গুগল কাজ করছে। এই আইনের লক্ষ্য হলো এআই সিস্টেমের ঝুঁকি নিরূপণ এবং স্বচ্ছতা বাড়ানো। যদিও কিছু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এই আইনের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন, গুগল তার দৃষ্টিভঙ্গি পরিষ্কার করার জন্য নিয়ন্ত্রকদের সাথে আলোচনা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রেও এআই নীতিমালা নিয়ে আলোচনা চলছে। বিচার বিভাগ গুগলের এআই কার্যক্রম সীমিত করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, কারণ গুগলের সার্চ ব্যবসা একটি বেআইনি একচেটিয়া ব্যবসা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই প্রেক্ষিতে গুগল তার এআই গবেষণা এবং শিক্ষামূলক কার্যক্রমকে জোরদার করার জন্য নতুন কৌশল গ্রহণ করছে।
গুগল জানিয়েছে যে এআই-এর কারণে কিছু চাকরি সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে, তবে অধিকাংশ চাকরিতে এআই-এর ভূমিকা থাকবে। এই বিষয়ে বিভিন্ন গবেষণা করা হয়েছে, যা দেখিয়েছে এআই কর্মীদের দক্ষতা বাড়াতে এবং নতুন কাজের সুযোগ তৈরি করতে সহায়ক হতে পারে। গুগলের মতে, এই পরিবর্তন মোকাবিলা করার জন্য পুনঃপ্রশিক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গুগল বিশ্বাস করে, এআই প্রযুক্তি শুধুমাত্র চাকরি অদল-বদল করবে না, বরং অনেক মানুষের জন্য নতুন দক্ষতা শেখার দরজা খুলে দেবে। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া, যা সফল করতে সরকারি এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোর যৌথ প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
গুগলের এআই শিক্ষা উদ্যোগ এবং নীতিমালা গঠনে ভূমিকা নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এটি কর্মী প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে সরকারি সংস্থাগুলোর সাথে সহযোগিতা পর্যন্ত বিস্তৃত। গুগলের লক্ষ্য শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ানো নয়, বরং এআই ব্যবহারের সঠিক নিয়ম-কানুন প্রতিষ্ঠা করা। এআই-এর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে গুগল এই ধরনের উদ্ভাবনী পদক্ষেপের মাধ্যমে বিশ্বকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।