চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানব মেটাপনিউমোভাইরাস (HMPV) সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ার পর এই ভাইরাস নিয়ে বিপুল আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে, অনেকেই একে কোভিড-১৯ মহামারীর সাথে তুলনা করছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করেছেন যে, এই ভাইরাস কোভিডের মতো মহামারি সৃষ্টির ঝুঁকি তৈরি করবে না।
এইচএমপিভি একটি পরিচিত ভাইরাস, যা সাধারণত শীতকালীন এবং বসন্তকালে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এটি নতুন কোনো ভাইরাস নয় এবং এটি ইতোমধ্যে বিশ্বজুড়ে প্রচলিত। তাই বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত যে, এটি কোনো নতুন মহামারী তৈরি করার সম্ভাবনা নেই। তবে, কিছু ক্ষেত্রে এটি গুরুতর শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে, বিশেষ করে শিশু, প্রবীণ এবং দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ব্যক্তিদের মধ্যে। এখন চলুন, এই ভাইরাস সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানি।
আরও পড়ুনঃ এমআরআই পরীক্ষা কি এবং এটি কিভাবে কাজ করে?
এইচএমপিভি ভাইরাস কি?
মানব মেটাপনিউমোভাইরাস (এইচএমপিভি) একটি শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণকারী ভাইরাস, যা প্রথম ২০০১ সালে নেদারল্যান্ডসে আবিষ্কৃত হয়। এটি মূলত একটি প্যারামাইক্সোভাইরাস পরিবারের সদস্য, যার মধ্যে আরও কিছু পরিচিত ভাইরাস রয়েছে যেমন রেসপিরেটরি সিনসিটিয়াল ভাইরাস (আরএসবি), হিউম্যান প্যারাইন্ফ্লুয়েঞ্জা, এবং মীজলস-মাম্পস। এইচএমপিভি সাধারণত শীতকালে এবং বসন্তে বৃদ্ধি পায় এবং এর প্রভাব পৃথিবীজুড়ে দেখা যায়।
এই ভাইরাস কিভাবে ছড়ায়?
এইচএমপিভি মূলত শ্বাসের মাধ্যমে ছড়ায়। কেউ যদি হাঁচি বা কাশির মাধ্যমে ভাইরাস ছড়ায়, অথবা যদি কোনো ব্যক্তি ভাইরাসে সংক্রামিত কোনো বস্তু বা পৃষ্ঠে হাত দেয় এবং পরে সে হাত মুখে দেয়, তবে ভাইরাস সংক্রমণ হতে পারে। এছাড়া, ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা অন্য কারো কাছ থেকে শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে ভাইরাসে সংক্রমিত হওয়া সম্ভব।
এইচএমপিভি-এর লক্ষণ এবং উপসর্গ
এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে সাধারণত ফ্লু বা সর্দির মতো উপসর্গ দেখা দেয়। এর মধ্যে প্রধান উপসর্গগুলো হলো:
- কাশি
- জ্বর
- নাক বন্ধ হওয়া
- শ্বাসকষ্ট
- গলা ব্যথা
- শরীরব্যথা
সবচেয়ে কম বয়সী শিশু, প্রবীণ বয়সী মানুষ এবং যাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের মধ্যে এই ভাইরাসের প্রভাব বেশি হতে পারে। যদি কোনো ব্যক্তি বিশেষভাবে দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার অধিকারী হন, যেমন ক্যান্সার আক্রান্ত ব্যক্তি বা গম্ভীর অসুস্থতা রয়েছে, তবে এই ভাইরাসের সংক্রমণ গুরুতর হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে, এই ভাইরাসের কারণে ব্রঙ্কিওলাইটিস (শ্বাসনালীতে প্রদাহ) বা নিউমোনিয়া পর্যন্ত হতে পারে।
এইচএমপিভি ভাইরাস কি কোভিড-১৯ এর মতো মহামারি তৈরি করতে পারে?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন যে, এইচএমপিভি কোনো মহামারী সৃষ্টি করবে না। এটি নতুন কোনো ভাইরাস নয়, বরং বহু বছর ধরে এটি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, বিশেষত শীতকালে, এর সংক্রমণ বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যায়। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে খুব কম সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হতে পারে, তবে সাধারণভাবে এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে হালকা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভাইরাসের নতুন কোনো সংস্করণ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম। এছাড়া, প্রাচীন সংক্রমণের ফলে পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের কিছুটা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (ইমিউনিটি) তৈরি হয়ে গেছে। ফলে, এটি মারাত্মক মহামারি হিসেবে দেখা দেবে না।
আরও পড়ুনঃ মেডিটেশন এর মাধ্যমে মস্তিষ্কের পরিবর্তন নিয়ে নতুন এক তথ্য দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা
এইচএমপিভি এর প্রাদুর্ভাব কোন কোন দেশে?
এইচএমপিভি-এর প্রাদুর্ভাব প্রধানত চীন দেশে। চীনে, বিশেষ করে উত্তরের অঞ্চলে, ২০২৪ সালের শীতকালে এইচএমপিভি-সহ অন্যান্য শ্বাসযন্ত্রের ভাইরাসের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে যে, চীনে এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব অন্যান্য দেশে পাওয়া চলমান মৌসুমী প্রবণতার মতো। ডব্লিউএইচও এর মতে, কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি দেখা যায়নি এবং চীনের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাও এ পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত। এমনকি যুক্তরাজ্যেও ২০২৪ সালের অক্টোবর মাস থেকে এইচএমপিভি সংক্রমণ বেড়েছে। তবে, সেখানে খুব বেশি উদ্বেগের কিছু নেই এবং সমস্ত ঘটনা মৌসুমী বৃদ্ধির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এইচএমপিভি থেকে রক্ষা পেতে কী করা উচিত?
যেহেতু বর্তমানে এইচএমপিভি এর জন্য কোনো নির্দিষ্ট ভ্যাকসিন বা অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই, তাই সাধারণ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণই সবচেয়ে ভালো। নিচে কিছু সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি দেয়া হলো, যা এই ভাইরাস ছড়ানো থেকে রোধ করতে সাহায্য করবে:
- কাশি বা হাঁচির সময় মুখ ঢেকে রাখুন।
- জনসমাগমে মাস্ক পরিধান করুন।
- নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস করুন।
- যদি আপনি বয়সে বৃদ্ধ বা অন্য কোনো কারণে ঝুঁকিতে থাকেন, তবে ভিড়ের মধ্যে যাওয়া থেকে বিরত থাকুন।
- ঘরের পরিবেশ পরিষ্কার রাখুন এবং আক্রান্ত ব্যক্তির কাছ থেকে দূরে থাকুন।
বিশেষত, শিশু, প্রবীণ ব্যক্তি, অথবা যাদের অন্য কোনো গুরুতর রোগ রয়েছে, তাদের দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
এইচএমপিভি একটি পরিচিত এবং মৌসুমী ভাইরাস, যার কোনো নতুন মহামারী সৃষ্টি করার সম্ভাবনা নেই। তবে, এটি কিছু মানুষের জন্য গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে, তাই এই ভাইরাসের লক্ষণ এবং উপসর্গ জানানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করা এবং সতর্কতা অবলম্বন করা এই ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সহায়ক হতে পারে। বর্তমানে, বিশেষজ্ঞরা এইচএমপিভি-কে কোভিড-১৯-এর মতো মহামারি হিসেবে দেখা না করার পরামর্শ দিচ্ছেন। তবে, জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা, এবং যারা ঝুঁকির মধ্যে আছেন তাদের সঠিক চিকিৎসা প্রদান করা জরুরি।
কার-টি (CAR-T) সেল থেরাপির মাধ্যমে ক্যান্সার নিরাময়ের নতুন সম্ভাবনা