আলোর গতির চেয়ে দ্রুত কিছু কি সম্ভব? বিজ্ঞান কী বলে?

বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বৈজ্ঞানিক গবেষণায় আলোর গতি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। আলোর গতি, যা প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২,৯৯,৭৯২ কিলোমিটার, পদার্থবিজ্ঞানের অনেকগুলো তত্ত্বের ভিত্তি। আলোর গতির চেয়ে দ্রুত কিছু চলা কি আদৌ সম্ভব? এই প্রশ্নটি বহু বছর ধরে বিজ্ঞানী, গবেষক এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতূহলের উদ্রেক করেছে। এই প্রবন্ধে আমরা আলোর গতির সীমা, তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা, এবং এই গতির চেয়ে দ্রুত চলা সম্ভব কিনা তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।

আলো হলো একটি তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ, যা আমাদেরকে পৃথিবীতে সমস্ত দৃশ্যমান জিনিস দেখতে সাহায্য করে। আলোর গতি হলো বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবচেয়ে দ্রুতগতির জিনিস। ১৯০৫ সালে আইনস্টাইন তার আপেক্ষিক তত্ত্বে (Theory of Relativity) আলোর গতির বিষয়টি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন। আপেক্ষিক তত্ত্ব অনুসারে, আলোর গতি কেবল তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গের গতি নয়, এটি সমস্ত তথ্য এবং শক্তি স্থানান্তরের জন্য একটি সীমা। কোনো বস্তু আলোর গতির চেয়ে দ্রুত যেতে পারে না, কারণ এমনটি করতে প্রচুর শক্তি প্রয়োজন যা বাস্তব জগতে অনন্ত শক্তির সমান।

আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব অনুসারে, আলোর গতির কাছাকাছি যাওয়ার সাথে সাথে বস্তুটির ভর বাড়তে থাকে এবং প্রয়োজনীয় শক্তিও অনন্তে চলে যায়। ফলে, আলোর গতির চেয়ে দ্রুত কোনো পদার্থ চলতে পারে না। এই কারণে আলোর গতি একটি সর্বোচ্চ সীমা হিসেবে ধরা হয়।

আরও পড়ুনঃ পদার্থবিদরা সময় পরিমাপের একটি নতুন উপায় খুঁজে পেয়েছেন

বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব এবং আলোর গতির সীমা

বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব (Special Theory of Relativity) অনুসারে, কোনো বস্তুকে আলোর গতিতে গতি দিতে গেলে তার ভর অনন্ত হতে হবে, যা বাস্তবে সম্ভব নয়। এই তত্ত্বে আলোর গতি একটি চূড়ান্ত সীমা হিসেবে বিবেচিত হয় এবং এর ওপর ভিত্তি করে পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন নিয়ম তৈরি হয়েছে। বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বের দুটি প্রধান নিয়ম হলো:

১. ভরের বৃদ্ধি: কোনো বস্তু আলোর গতির কাছাকাছি গতি পেতে শুরু করলে তার ভর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। ফলে, বস্তুকে আলোর গতিতে পৌঁছাতে অসীম পরিমাণ শক্তি প্রয়োজন।

২. সময় প্রসারণ: আলোর গতির কাছাকাছি গতি পেতে গেলে সময় ধীরে চলে। অর্থাৎ, উচ্চ গতিতে চলা বস্তুর জন্য সময়ের অভিজ্ঞতা ধীরে হয়, যা একে সময় প্রসারণ বলে।

এই দুই তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে, বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন যে আলোর গতির চেয়ে দ্রুত কোনো পদার্থ চলা সম্ভব নয়।

টাচিয়ন: কাল্পনিক কণা

যদিও আলোর গতির চেয়ে দ্রুত কোনো বস্তু চলতে পারে না বলে বিবেচনা করা হয়, কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানে কিছু কাল্পনিক কণা রয়েছে যাদেরকে ‘টাচিয়ন’ (Tachyon) বলা হয়। টাচিয়ন হলো এমন একটি কাল্পনিক কণা যার গতি আলোর গতির চেয়ে দ্রুত বলে কল্পনা করা হয়। তবে এই কণার অস্তিত্ব কখনো পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়নি এবং এটি শুধুমাত্র তাত্ত্বিকভাবেই বিদ্যমান।

টাচিয়নের তত্ত্ব প্রমাণ করে যে এই ধরনের কণা কখনোই আলোর গতির কম গতিতে চলতে পারে না, বরং এটি সবসময় আলোর গতির চেয়ে দ্রুত চলে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই বিজ্ঞানীরা একে বাস্তব কণা হিসেবে গণ্য করেন না।

ওয়ার্মহোল এবং স্থানকাল ভ্রমণ

আলোকের গতির চেয়ে দ্রুত ভ্রমণের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা ওয়ার্মহোল (Wormhole) ধারণাটি বিবেচনা করেন। ওয়ার্মহোল হলো একটি তাত্ত্বিক স্থান-কাল সুড়ঙ্গ, যা সময় এবং স্থানকে সংক্ষিপ্ত করে দুই দূরবর্তী স্থানকে সংযুক্ত করতে পারে। সহজভাবে বললে, ওয়ার্মহোল হলো একটি শর্টকাট যা দুটি স্থানকে দ্রুত সংযুক্ত করে দেয়।

আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব অনুসারে ওয়ার্মহোল সম্ভব হতে পারে, কিন্তু এটি অত্যন্ত অসম্ভব এবং জটিল। ওয়ার্মহোল তৈরির জন্য নেগেটিভ শক্তির প্রয়োজন হয়, যা এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের কাছে অজানা। তাছাড়া, ওয়ার্মহোল স্থিতিশীল রাখাও অত্যন্ত কঠিন কাজ। এই কারণে বিজ্ঞানীরা এখনো এ বিষয়ে নিশ্চিত নন যে এটি বাস্তবে তৈরি করা সম্ভব কিনা।

মানব মস্তিষ্কের এমন কিছু তথ্য যা আপনি আগে কখনো শোনেননি!

আলকুবিয়েরে ড্রাইভ: একটি সম্ভাব্য পদ্ধতি

আলোকের গতির চেয়ে দ্রুত ভ্রমণের জন্য আরেকটি সম্ভাব্য পদ্ধতি হলো আলকুবিয়েরে ড্রাইভ (Alcubierre Drive)। মিগুয়েল আলকুবিয়েরে নামে একজন বিজ্ঞানী এই তত্ত্বটি ১৯৯৪ সালে প্রস্তাব করেন। আলকুবিয়েরে ড্রাইভের মূল ধারণা হলো স্থানকাল (spacetime) বিকৃত করা। এতে করে একটি মহাকাশযানকে আলোর গতির চেয়ে দ্রুত চলা সম্ভব হতে পারে।

আলকুবিয়েরে ড্রাইভে মহাকাশযানটি নিজে চলবে না, বরং এটি চারপাশের স্থানকালকে সংকুচিত এবং প্রসারিত করবে, যার ফলে এটি আলোর গতির চেয়ে দ্রুত গতি করতে পারবে। তবে এই পদ্ধতির জন্যও নেগেটিভ শক্তির প্রয়োজন হয়, যা এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে বাস্তবে প্রাপ্ত নয়। এই কারণে এটি কেবল একটি তাত্ত্বিক তত্ত্ব হিসেবেই রয়ে গেছে।

স্থানীয় আপেক্ষিকতা এবং বাস্তবতার সীমাবদ্ধতা

আলোর গতির চেয়ে দ্রুত ভ্রমণ সম্ভব কিনা তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনো বিতর্ক করে চলেছেন। আলোর গতি পদার্থবিজ্ঞানে একটি চূড়ান্ত সীমা হিসেবে বিবেচিত, কিন্তু এর বাইরে যেসব তত্ত্ব প্রস্তাব করা হয়েছে সেগুলোর বাস্তবতা এখনো প্রমাণিত হয়নি। স্থানীয় আপেক্ষিকতা অনুসারে, স্থানকালের ভ্রমণ বা স্থানীয় বিকৃতি আমাদের বর্তমান বিজ্ঞানের জ্ঞানের বাইরে।

বর্তমানে পদার্থবিজ্ঞানীদের মতামত হলো, আলোর গতির চেয়ে দ্রুত কিছু ভ্রমণ করতে হলে আমাদেরকে পদার্থবিজ্ঞানের প্রচলিত তত্ত্বের বাইরে গিয়ে নতুন কিছু আবিষ্কার করতে হবে। এই ক্ষেত্রে নতুন শক্তির উৎস, নতুন পদার্থ বা স্থানকালের সম্পূর্ণ নতুন ধরণের গঠন প্রয়োজন হতে পারে।

বিজ্ঞান এখন পর্যন্ত আলোর গতির চেয়ে দ্রুত কিছু ভ্রমণ করা সম্ভব কিনা তার সঠিক উত্তর দিতে পারেনি। আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব অনুসারে, আলোর গতি সর্বোচ্চ সীমা এবং এটি ছাড়িয়ে যাওয়া বাস্তবে অসম্ভব। তবে টাচিয়ন, ওয়ার্মহোল এবং আলকুবিয়েরে ড্রাইভের মতো তত্ত্বগুলো আমাদেরকে নতুন কিছু কল্পনা করতে এবং বুঝতে সাহায্য করে।

এই গবেষণাগুলো এখনও প্রাথমিক স্তরে রয়েছে এবং বাস্তবে এগুলোর প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিজ্ঞানীরা আরও গবেষণা করছেন এবং ভবিষ্যতে হয়তো আমরা এই প্রশ্নের উত্তর পেতে পারি। আলোর গতির চেয়ে দ্রুত কিছু ভ্রমণ করা সম্ভব হলে তা কেবল আমাদের বিশ্ব সম্পর্কে আমাদের ধারণা পরিবর্তন করবে না, বরং এটি আমাদেরকে নতুন দিগন্তের দিকে নিয়ে যাবে।

আরও পড়ুনঃ মস্তিষ্কে ভালোবাসা আর ক্ষুধার মধ্যে সংঘর্ষ হলে কিভাবে মস্তিষ্ক সিদ্ধান্ত নেয়?

WhatsApp Group Join Now
Telegram Group Join Now
instagram Group Join Now

সাম্প্রতিক খবর

.আরো