আমরা যারা কম্পিউটার ব্যবহার করি তারা মাউস এর গুরুত্বটা কতটুকু তা ভালো করেই জানি। এই একটা জিনিস না থাকলে আমাদের কাজের গতি অসম্ভবভাবে কমে যায়। যদিও ল্যাপটপ টাচপ্যাডের মাধ্যমে মাউস এর কাজ করা যায় তারপরও মাউস এর মত দ্রুত কাজ করতে সক্ষম নয় এটি। তাই মাউস এর জনপ্রিয়তা অনেক। আজ আমরা এই মাউস সম্পর্কে বিস্তারিত জানবো এই প্রবন্ধটিতে। মাউস কি, মাউস এর ইতিহাস, এটি কিভাবে কাজ করে ইত্যাদি।
মাউস কি?
মাউস একটি ইনপুট ডিভাইস যা কম্পিউটারের স্ক্রিনে কার্সর বা পয়েন্টার নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যবহৃত হয়। এটি ব্যবহারকারীদের স্ক্রিনের মধ্যে বিভিন্ন আইকন, মেনু বা ফাইল নির্বাচন এবং খুলতে সাহায্য করে। সাধারণত, মাউসে দুটি প্রধান বোতাম থাকে – বাম বোতাম এবং ডান বোতাম। এছাড়াও, বেশিরভাগ মাউসে একটি স্ক্রোল হুইল থাকে, যা পৃষ্ঠাগুলি উপরে-নিচে স্ক্রল করার জন্য ব্যবহৃত হয়।
আরও পড়ুনঃ ফিঙ্গারপ্রিন্ট প্রযুক্তি কি কেন ও কিভাবে?
মাউস তৈরির ইতিহাস
মাউসের উৎপত্তি ১৯৬০-এর দশকে, যখন ডগলাস এঙ্গেলবার্ট নামক একজন প্রকৌশলী এটি উদ্ভাবন করেন। সেই সময়ে, মাউসটি কাঠ দিয়ে তৈরি হয়েছিল এবং এর নীচে দুটি চাকা ছিল, যা গতি শনাক্ত করত। মূলত, এটি কম্পিউটারের স্ক্রিনে কার্সর নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। এই উদ্ভাবনটি আধুনিক কম্পিউটিংয়ে বিপ্লব ঘটানোর মাইলফলক হিসেবে কাজ করেছিল।
“মাউস” নামটি তার আকার এবং কার্যপ্রণালীর সাদৃশ্যের কারণে দেওয়া হয়। এর গঠন ছোট প্রাণীর মতো ছিল এবং এর সাথে একটি লম্বা তার সংযুক্ত ছিল, যা একটি লেজের মতো মনে হতো। ১৯৮০-এর দশকে, অ্যাপল কম্পিউটার প্রথমবারের মতো মাউসকে একটি ব্যক্তিগত কম্পিউটারের সাথে সংযুক্ত করে বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করে। এই উদ্যোগ মাউসকে দ্রুত জনপ্রিয় এবং কম্পিউটারের একটি অপরিহার্য অংশে পরিণত করে।
মাউস কিভাবে কাজ করে?
মাউসের কাজের পদ্ধতি বেশ সহজ। মাউসটি সাধারণত একটি কম্পিউটারের সাথে ইউএসবি তার বা ওয়্যারলেস প্রযুক্তির মাধ্যমে সংযুক্ত থাকে। যখন ব্যবহারকারী মাউসটি সরায়, তখন এর অভ্যন্তরীণ সেন্সর সেই গতিবিধি শনাক্ত করে এবং সেই অনুযায়ী কার্সর স্ক্রিনে স্থানান্তরিত হয়। কার্সর মোভমেন্ট প্রক্রিয়া সাধারণত এলইডি বা লেজার লাইট ব্যবহার করে কাজ করে। যখন মাউসটি পৃষ্ঠে সরানো হয়, তখন লাইটটি পৃষ্ঠের অবস্থান এবং গতিবিধি শনাক্ত করে। এর সেন্সর সেই ডেটা ক্যাপচার করে কম্পিউটারে প্রেরণ করে, যার মাধ্যমে কার্সরের সুনির্দিষ্ট গতি নিশ্চিত হয়। এটি বিশেষ করে মসৃণ পৃষ্ঠে কাজ করতে খুবই কার্যকর।
স্ক্রল হুইল কিভাবে কাজ করে?
স্ক্রল হুইল মাউসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা স্ক্রলিং প্রক্রিয়াকে সহজ এবং মসৃণ করে তোলে। এটি একটি ছোট চাকতির মতো গঠিত, যা ব্যবহারকারী আঙুল দিয়ে ঘোরান। স্ক্রল হুইলটি ঘোরানোর সময় একটি বিশেষ কোডেড ডিস্কও ঘোরে, যা আলো বা চুম্বকীয় সেন্সরের সাহায্যে ঘূর্ণনের দিক ও গতি শনাক্ত করে। এই সংকেত কম্পিউটারে পাঠানো হয়, এবং কম্পিউটার সেই অনুযায়ী স্ক্রিনে পৃষ্ঠাগুলি উপরে বা নিচে সরায়। এর ফলে ব্যবহারকারীরা দ্রুত এবং সহজেই তথ্য দেখতে পারেন।
মাউস এর প্রকারভেদ
মাউস বিভিন্ন ধরনের হতে পারে, এবং প্রতিটি ধরনের মাউসের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
১। বল মাউস: এটি প্রথম দিকের মাউসগুলোর মধ্যে একটি, যেখানে একটি গোলাকার রাবারের বল ব্যবহৃত হয়। মাউসটি যখন সরানো হয়, তখন বলটি ঘোরে এবং সেই ঘূর্ণনের মাধ্যমে পয়েন্টার স্থানান্তরিত হয়। যদিও এই ধরনের মাউস এখন প্রায় বিলুপ্ত, এটি কম্পিউটারের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ।
২। অপটিক্যাল মাউস: বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাউস। এটি এলইডি বা লেজার প্রযুক্তি ব্যবহার করে কাজ করে এবং এর গতি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট। অপটিক্যাল মাউস মসৃণ পৃষ্ঠে ভালো কাজ করে এবং এটি সহজেই পরিচ্ছন্ন রাখা যায়।
৩। লেজার মাউস: অপটিক্যাল মাউসের একটি উন্নত সংস্করণ। এটি লেজার প্রযুক্তি ব্যবহার করে এবং আরো সূক্ষ্ম এবং নির্ভুল নিয়ন্ত্রণ প্রদান করে। গেমিং এবং গ্রাফিক্স ডিজাইনের জন্য এই মাউসটি আদর্শ।
৪। ওয়্যারলেস মাউস: এই ধরনের মাউস তারবিহীন এবং রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি বা ব্লুটুথ প্রযুক্তি ব্যবহার করে। এটি ব্যবহার করা খুবই সুবিধাজনক কারণ এটি তারের ঝামেলা দূর করে। ওয়্যারলেস মাউস সাধারণত ব্যাটারি দিয়ে চলে।
৫। ট্র্যাকবল মাউস: ট্র্যাকবল মাউসে একটি বড় বল থাকে, যা হাত দিয়ে ঘোরানো হয়। এটি বিশেষ ধরনের কাজ, যেমন ডিজাইন এবং স্থাপত্যের জন্য ব্যবহৃত হয়। এই মাউস স্থির থাকে এবং শুধুমাত্র বল ঘুরিয়ে কাজ করা যায়।
৬। এরগোনমিক মাউস: এটি বিশেষভাবে ডিজাইন করা হয় যাতে ব্যবহারকারীদের হাতে আরাম দেয় এবং দীর্ঘ সময় ব্যবহার করার পরেও ক্লান্তি অনুভূত না হয়। যারা দীর্ঘ সময় কম্পিউটার ব্যবহার করেন তাদের জন্য এটি উপকারী।
৭। গেমিং মাউস: গেমারদের জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা মাউস। এটি দ্রুত এবং সুনির্দিষ্ট কার্যক্ষমতা প্রদান করে। গেমিং মাউসে অতিরিক্ত বোতাম এবং উচ্চতর ডিপিআই (ডটস পার ইঞ্চি) থাকে, যা গেম খেলার অভিজ্ঞতা উন্নত করে।
৮। টাচ মাউস: এই মাউসে কোনো বোতাম থাকে না। এটি টাচ সেন্সর প্রযুক্তি ব্যবহার করে কাজ করে এবং খুব আধুনিক ও আড়ম্বরপূর্ণ। টাচ মাউস সাধারণত ল্যাপটপের সাথে ব্যবহৃত হয়।
মাউস একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইনপুট ডিভাইস, যা কম্পিউটারের ব্যবহার সহজ করে তুলেছে। এটি বিভিন্ন ধরনের ফাইল এবং প্রোগ্রাম পরিচালনা করতে সাহায্য করে। মাউসের বিভিন্ন প্রকারভেদ এবং বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী এটি ব্যবহারকারীদের প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম। প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মাউসেরও উন্নতি হচ্ছে এবং নতুন নতুন ধরনের মাউস বাজারে আসছে, যা আমাদের কাজকে আরও সহজ এবং গতিশীল করে তুলছে।