ক্রিস্টালের মাধ্যমে মেমোরি স্টোরেজ তৈরির নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন বিজ্ঞানীরা

কম্পিউটারে তথ্য সংরক্ষণের জন্য দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। একসময় ছিদ্রযুক্ত কার্ড ব্যবহৃত হতো, পরে হার্ডড্রাইভ, অপটিক্যাল ডিস্ক এবং ফ্ল্যাশ মেমোরির মতো উন্নত প্রযুক্তি এসেছে। তবে প্রতিনিয়ত নতুন উপায় উদ্ভাবিত হচ্ছে, যা তথ্য সংরক্ষণের ক্ষমতা বাড়িয়ে তুলছে। সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা একটি নতুন পদ্ধতির সন্ধান পেয়েছেন যেখানে ক্ষুদ্রতম পরমাণুগত অসম্পূর্ণতা ব্যবহার করে তথ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব।

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের পৃটজকার স্কুল অফ মলিকিউলার ইঞ্জিনিয়ারিং-এর গবেষকরা আবিষ্কার করেছেন যে ক্রিস্টালের অভ্যন্তরে থাকা ছোট ছোট ফাঁকা স্থানকে তথ্য সংরক্ষণের জন্য ব্যবহার করা যায়। এই গবেষণাটি ন্যানোফোটোনিকস নামক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই পদ্ধতিতে একটি মিলিমিটার আকারের স্ফটিকে টেরাবাইট পরিমাণ তথ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব।

তথ্য সংরক্ষণের জন্য সাধারণত বাইনারি কোড (০ এবং ১) ব্যবহার করা হয়। প্রচলিত ডিভাইসগুলোতে এটি ইলেকট্রিক্যাল সিগন্যাল, চৌম্বক ক্ষেত্র বা অপটিক্যাল পরিবর্তনের মাধ্যমে ঘটে। তবে নতুন এই গবেষণায় তথ্য সংরক্ষণের জন্য পরমাণুগত অসম্পূর্ণতা (defects) ব্যবহার করা হয়েছে।

একটি স্ফটিকের কাঠামোতে স্বাভাবিকভাবেই কিছু স্থান ফাঁকা থাকে যেখানে পরমাণু অনুপস্থিত। গবেষকরা এই ফাঁকা স্থানগুলোকে তথ্য সংরক্ষণের জন্য ব্যবহার করেছেন। যখন আলোক রশ্মি বা লেজারের মাধ্যমে নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যে আলো ফেলা হয়, তখন এই ফাঁকা স্থানগুলোতে ইলেকট্রন প্রবাহিত হতে পারে। ইলেকট্রনের উপস্থিতি মানে ১, আর অনুপস্থিতি মানে ০। এই পদ্ধতিতে বিপুল পরিমাণ তথ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব।

এই গবেষণার মূল অনুপ্রেরণা এসেছে রেডিয়েশন ডোসিমিটার থেকে, যা সাধারণত হাসপাতাল ও গবেষণা কেন্দ্রে বিকিরণের মাত্রা পরিমাপের জন্য ব্যবহৃত হয়। গবেষণার প্রধান গবেষক লিওনার্দো ফ্রাঙ্কা জানান, তিনি প্রথমে বিকিরণ পরিমাপক যন্ত্রের তথ্য সংরক্ষণ করার সক্ষমতা নিয়ে গবেষণা করছিলেন। পরবর্তীতে তিনি দেখেন যে একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রচলিত মেমোরি ডিভাইসের তুলনায় অনেক বেশি তথ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব।

এই পদ্ধতিতে গবেষকরা বিশেষভাবে বিরল মৌলগুলোর (rare earth elements) মধ্যে একটি, প্রাসোডিয়োমিয়াম (Praseodymium), এবং ইট্রিয়াম অক্সাইড (Yttrium Oxide) ক্রিস্টাল ব্যবহার করেছেন। এই বিরল মৌলগুলোর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এগুলো আলোর সঙ্গে প্রতিক্রিয়া করে নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণ শোষণ এবং নির্গমন করতে পারে। এই বৈশিষ্ট্যের কারণে তথ্য সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার করা সহজ হয়।

গবেষকরা দেখেছেন যে আলোর প্রভাব ফেলে ক্রিস্টালের ফাঁকা স্থানগুলোতে ইলেকট্রন আটকে রাখা যায়। যখন নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোর মাধ্যমে ইলেকট্রন মুক্ত করা হয়, তখন সঞ্চিত তথ্য পুনরুদ্ধার করা যায়।

এই নতুন প্রযুক্তির অন্যতম সুবিধা হলো এটি প্রচলিত ডেটা স্টোরেজ ডিভাইসের তুলনায় অনেক ছোট আকারে বিশাল পরিমাণ তথ্য ধারণ করতে পারে। গবেষকরা দাবি করছেন, মাত্র এক মিলিমিটার আকারের স্ফটিকে এক বিলিয়নেরও বেশি তথ্যকোষ (memory cell) রাখা সম্ভব। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ভবিষ্যতে কম্পিউটার, মোবাইল, এবং ডাটা সার্ভারের তথ্য সংরক্ষণের পদ্ধতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসতে পারে।

বর্তমানে প্রচলিত মেমোরি ডিভাইস যেমন হার্ডড্রাইভ বা সলিড স্টেট ড্রাইভের (SSD) সংরক্ষণ ক্ষমতা ক্রমশ উন্নত হচ্ছে, তবে তারা এখনো পারমাণবিক পর্যায়ে কাজ করতে সক্ষম নয়। এই নতুন গবেষণার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, কিভাবে পারমাণবিক পর্যায়ে তথ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব।

তথ্য সংরক্ষণের জন্য বিদ্যমান প্রযুক্তিগুলো সাধারণত বড় আকারের এবং প্রচুর শক্তি ব্যয় করে। অন্যদিকে, পরমাণুগত অসম্পূর্ণতার উপর ভিত্তি করে তৈরি এই নতুন স্টোরেজ সিস্টেম অনেক কম জায়গা নেয় এবং কম শক্তি ব্যয় করে। ফলে এটি পরিবেশবান্ধবও হতে পারে।

তবে এই প্রযুক্তির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। গবেষকরা বলছেন, বর্তমানে এই পদ্ধতির স্থায়িত্ব ও পুনরাবৃত্তিযোগ্যতা (reliability) পরীক্ষা করা হচ্ছে। এই স্টোরেজ ডিভাইস কতদিন কার্যকর থাকবে এবং এটি কত দ্রুত তথ্য পড়তে ও লিখতে পারবে, তা এখনো গবেষণার বিষয়।

যদি এই প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়, তবে এটি তথ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এক বিপ্লব আনতে পারে। বর্তমান স্টোরেজ ডিভাইসগুলোর তুলনায় এটি বেশি টেকসই, শক্তি-সাশ্রয়ী এবং জায়গা বাঁচানোর সুবিধা দেবে। বিশেষ করে বড় বড় তথ্যকেন্দ্র, গবেষণাগার এবং মোবাইল প্রযুক্তিতে এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে পারে।

গবেষকরা আশাবাদী যে, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির আরো উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব হবে এবং এটি প্রচলিত তথ্য সংরক্ষণের পদ্ধতিকে পুরোপুরি বদলে দিতে পারে। এটি শুধু বড় বড় তথ্যকেন্দ্রের জন্য নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত ছোট ছোট স্মার্ট ডিভাইসেও প্রয়োগ করা সম্ভব হতে পারে।

বিজ্ঞানীরা ৩ডি ন্যান্ড ফ্ল্যাশ মেমোরি আবিষ্কার করেছেন

WhatsApp Group Join Now
Telegram Group Join Now
instagram Group Join Now

সাম্প্রতিক খবর

.আরো