আলো ব্যবহার করে উচ্চগতির ইন্টারনেট সরবরাহ করবে Taara চিপ

গুগল নতুন প্রজন্মের Taara চিপ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছে। এই নতুন চিপ তারবিহীন ইন্টারনেট সংযোগ সরবরাহ করতে পারে এবং এটি আলো ব্যবহার করে ডেটা প্রেরণ করতে সক্ষম। Taara চিপ প্রতি সেকেন্ডে ২০Gbps গতিতে ইন্টারনেট সরবরাহ করতে পারে, যা প্রচলিত ইন্টারনেট সংযোগের তুলনায় অত্যন্ত দ্রুত।

আলফাবেট-এর অধীনস্থ X ল্যাব দীর্ঘদিন ধরে এই Taara চিপের উন্নয়ন নিয়ে কাজ করছে। অবশেষে তাদের গবেষণা সফল হয়েছে, এবং এই চিপটি সাধারণ ফাইবার অপটিক কেবল ছাড়াই আলোর মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদানের সক্ষমতা অর্জন করেছে। এটি মূলত সিলিকন ফটোনিক্স প্রযুক্তি ব্যবহার করে কাজ করে, যা আলোর মাধ্যমে ডেটা পাঠাতে সক্ষম।

এই চিপটি ফাইবার অপটিক প্রযুক্তির মতোই কাজ করে, তবে এখানে কোনো কেবল ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। এটি বাতাসের মাধ্যমে তথ্য পাঠাতে পারে, যা ইন্টারনেট সংযোগের একটি নতুন যাত্রা। সাধারণত, ফাইবার অপটিক ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপন করতে প্রচুর পরিমাণে খরচ এবং সময় ব্যয় হয়। তবে Taara প্রযুক্তির মাধ্যমে কম খরচে দ্রুতগতির ইন্টারনেট সরবরাহ করা সম্ভব হবে। বিশেষত, এটি এমন এলাকাগুলোর জন্য কার্যকর হবে, যেখানে ফাইবার সংযোগ স্থাপন করা কঠিন কিংবা ব্যয়বহুল।

Taara চিপের নতুন সংস্করণ আগের তুলনায় অনেক ছোট এবং উন্নত। যেখানে পূর্ববর্তী সংস্করণটি একটি ট্রাফিক লাইটের সমান ছিল, নতুন চিপটি আকারে মাত্র একটি নখের সমান। ফলে এটি স্থাপন করা সহজ এবং ব্যবহারও অনেক সুবিধাজনক।

প্রাথমিকভাবে, Taara প্রযুক্তি X-এর Project Loon-এর জন্য তৈরি করা হয়েছিল, যা হাই-অলটিচিউড বেলুন ব্যবহার করে ইন্টারনেট সরবরাহের পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু ২০২১ সালে এই প্রকল্পটি বন্ধ করে আলফাবেট সম্পূর্ণরূপে Taara চিপের উন্নয়নে মনোনিবেশ করে। প্রকল্পটি বন্ধ করার অন্যতম কারণ ছিল কার্যকারিতার সীমাবদ্ধতা এবং ব্যয় সংকট। তবে, সেই গবেষণার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে Taara চিপের উন্নয়ন ঘটিয়েছে।

এই চিপটি ব্যবহার করে ইতোমধ্যেই কঙ্গো নদী এবং নাইরোবির বিভিন্ন এলাকায় ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সরবরাহের সফল পরীক্ষা করা হয়েছে। পরীক্ষাগুলোতে দেখা গেছে, এটি উচ্চ গতির ইন্টারনেট প্রদান করতে সক্ষম এবং দীর্ঘ দূরত্বেও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে।

Taara চিপ মূলত ইনফ্রারেড এবং দৃশ্যমান আলোর মাঝামাঝি অংশের ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক তরঙ্গ ব্যবহার করে ডেটা স্থানান্তর করে, যা খালি চোখে দেখা যায় না। এতে করে ২০ কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ প্রদান করা সম্ভব। অন্যদিকে, প্রচলিত ফাইবার অপটিক ইন্টারনেটের ক্ষেত্রে এই পরিমাণ দূরত্বে সংযোগ স্থাপনের জন্য কেবলের প্রয়োজন হয়, যা অনেক ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ।

Taara চিপের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইনস্টল করা সম্ভব, যেখানে প্রচলিত ফাইবার অপটিক ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপনে মাস বা বছর সময় লেগে যায়। এটি শহরাঞ্চল, গ্রামাঞ্চল এবং এমনকি দুর্গম এলাকাগুলোতেও দ্রুত ইন্টারনেট সংযোগ প্রদান করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন, এই প্রযুক্তি ২০২৬ সাল নাগাদ বাজারে আসবে। তবে, শুরুতে এর গ্রহণযোগ্যতা তুলনামূলক ধীরগতিতে হতে পারে, বিশেষত সাধারণ ব্যবহারকারীদের মধ্যে। মূলত, এটি প্রথমে সরকারি প্রকল্প, টেলিকম সংস্থা এবং কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোতে ব্যবহারের জন্য উপলব্ধ হতে পারে।

বিশ্বের প্রায় তিন বিলিয়ন মানুষ এখনও ইন্টারনেট সংযোগ থেকে বঞ্চিত। Taara চিপ এই সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। Taara-এর জেনারেল ম্যানেজার মাহেশ কৃষ্ণস্বামী বলেছেন, ‘বর্তমানে, অনেক জায়গায় ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেও এর গতি অত্যন্ত ধীর। স্টারলিংক-এর মতো প্রযুক্তি উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ইন্টারনেট পৌঁছে দিলেও এটি যথেষ্ট নয়। কারণ বেশি সংখ্যক ব্যবহারকারী থাকলে গতি কমে যায়।’

Taara প্রযুক্তি স্টারলিংকের তুলনায় ১০ থেকে ১০০ গুণ বেশি ব্যান্ডউইথ দিতে সক্ষম এবং এটি তুলনামূলকভাবে অনেক সস্তায় ব্যবহার করা যাবে। এটি ইন্টারনেট প্রোভাইডারদের জন্য একটি অত্যন্ত লাভজনক সমাধান হতে পারে। কারণ এটি সহজে ইনস্টল করা যায়, দ্রুত গতির সংযোগ প্রদান করে এবং রক্ষণাবেক্ষণের খরচও কম।

আলফাবেট আশা করছে, এই চিপের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় যানবাহনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিতে দ্রুতগতির যোগাযোগের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। স্বয়ংক্রিয় যানবাহনের ক্ষেত্রে উচ্চ গতির ডেটা স্থানান্তর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ স্বয়ংক্রিয় গাড়িগুলোকে মুহূর্তের মধ্যে তথ্য বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। যদি গাড়িগুলোর মধ্যে দ্রুতগতির যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, তবে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা হ্রাস পাবে এবং যান চলাচল আরও নিরাপদ হবে।

তাছাড়া, চিকিৎসা ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তির ব্যবহার হতে পারে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে দ্রুতগতির ইন্টারনেট সংযোগের অভাবে অনেক সময় টেলিমেডিসিন পরিষেবা ব্যাহত হয়। Taara প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে, ফলে উন্নত চিকিৎসা সেবা প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষদের কাছেও পৌঁছানো যাবে।

গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে Taara চিপ আরও উন্নত করা হলে এটি আরও বড় পরিসরে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে। এটি কেবল ইন্টারনেট সংযোগের গতি বৃদ্ধিই নয়, বরং যোগাযোগের পুরো প্রক্রিয়াকেই নতুন মাত্রায় নিয়ে যেতে পারে। আলফাবেট-এর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা মনে করেন, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির আরও বিস্তৃত প্রয়োগ দেখা যাবে, যা বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।

চীন এক অত্যাধুনিক চিপ তৈরি করেছে যা ভবিষ্যৎ যোগাযোগ ব্যবস্থাকে বদলে দিতে পারে

WhatsApp Group Join Now
Telegram Group Join Now
instagram Group Join Now

সাম্প্রতিক খবর

.আরো