এক্স-রে কি?
এক্স-রে হলো একটি বিশেষ ধরনের ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক রশ্মি, যা অতি উচ্চ শক্তির হয় এবং মানুষের শরীরের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর ছবি তোলার জন্য ব্যবহৃত হয়। এটি সাধারণত চিকিৎসা ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয়ের জন্য ব্যবহার করা হয়। এক্স-রে এমন একটি প্রযুক্তি যা হাড়, দাঁত, ফুসফুস, হার্ট, রক্তনালী এবং অন্যান্য টিস্যু পরীক্ষার জন্য বিশেষভাবে কার্যকর। এক্স-রে পরীক্ষার মাধ্যমে সহজেই হাড় ভাঙা, সংক্রমণ, টিউমার, এবং অন্যান্য সমস্যার নির্ণয় সম্ভব।
এক্স-রে কিভাবে কাজ করে?
এক্স-রে কাজ করে রশ্মি নির্গমনের মাধ্যমে। যখন এক্স-রে রশ্মি শরীরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়, তখন বিভিন্ন ধরনের টিস্যু এবং অঙ্গ এই রশ্মিগুলোকে শোষণ করে। নিচে এক্স-রে কাজ করার পদ্ধতি সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
- এক্স-রে মেশিন থেকে উচ্চ শক্তির এক্স-রে রশ্মি নির্গত হয়।
- এই রশ্মিগুলো শরীরের বিভিন্ন টিস্যু দিয়ে প্রবাহিত হয়। হাড় ও ঘন টিস্যুগুলো এক্স-রে রশ্মি বেশি শোষণ করে, আর কোমল টিস্যু ও বাতাস এক্স-রে কম শোষণ করে।
- এক্স-রে ডিটেক্টর বা ফিল্মে এই রশ্মিগুলো পৌঁছায় এবং একটি ছবি তৈরি হয়। ঘন টিস্যু যেমন হাড় সাদা রঙে দেখা যায়, আর কোমল টিস্যু ধূসর রঙে দেখা যায়। বাতাসযুক্ত অংশগুলো কালো রঙে প্রদর্শিত হয়।
এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শরীরের অভ্যন্তরীণ কাঠামো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। এটি অত্যন্ত দ্রুত এবং সহজ পদ্ধতি, যা রোগ নির্ণয়ে সহায়তা করে।
আরও পড়ুনঃ সিটি স্ক্যান কি? সিটি স্ক্যান কেন করা? এই নিয়ে বিস্তারিত তথ্য
এক্স-রে রশ্মি কিভাবে তৈরি হয়?
এক্স-রে রশ্মি তৈরি হওয়ার পদ্ধতি বেশ বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি। এটি বিশেষভাবে ডিজাইন করা এক্স-রে টিউবের সাহায্যে তৈরি হয়। এক্স-রে টিউব একটি সিলিন্ডার আকৃতির যন্ত্র, যেখানে ভ্যাকুয়াম পরিবেশে দুটি ইলেকট্রোড ক্যাথোড এবং অ্যানোড স্থাপন করা হয়। নিচে এক্স-রে রশ্মি তৈরি ধাপগুলো উল্লেখ করা হলো-
- ক্যাথোড থেকে ইলেকট্রন নির্গমন: টিউবের ভেতরে উচ্চ তাপমাত্রায় উত্তপ্ত ফিলামেন্ট থেকে ইলেকট্রন নির্গত হয়।
- ইলেকট্রনকে ত্বরান্বিত করা: উচ্চ ভোল্টেজের মাধ্যমে এই ইলেকট্রনগুলোকে অ্যানোডের দিকে ত্বরান্বিত করা হয়।
- অ্যানোডে আঘাত: ইলেকট্রনগুলো যখন অ্যানোডের পৃষ্ঠে আঘাত করে, তখন তাদের উচ্চ শক্তি তাপ এবং এক্স-রে রশ্মি হিসেবে নির্গমন হয়।
- ফোকাসিং: এক্স-রে টিউবে উপস্থিত বিশেষ ফোকাসিং ডিভাইস এই রশ্মিগুলোকে কেন্দ্রীভূত করে একটি নির্দিষ্ট স্থানে প্রক্ষেপণ করে।
এটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে সর্বোচ্চ কার্যকারিতা এবং নির্ভুলতা নিশ্চিত হয়।
এক্স-রে আবিষ্কারের ইতিহাস
এক্স-রে’র আবিষ্কার আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক বড় অগ্রগতি। ১৮৯৫ সালে জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী উইলহেলম কনরাড রন্টজেন (Wilhelm Conrad Röntgen) প্রথম এক্স-রে আবিষ্কার করেন। তিনি এটি “এক্স-রে” নাম দিয়েছিলেন কারণ তখন এটি একটি অজানা রশ্মি ছিল। রন্টজেন একটি বিশেষ ধরনের ক্যাথোড রশ্মি পরীক্ষার সময় দেখেন, একটি অজানা রশ্মি শক্ত কাগজ বা কার্ডবোর্ডের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। তখন তিনি এই আইডিয়াকে কাজে লাগিয়ে তিনি তার স্ত্রীর হাতের এক্স-রে ছবি তুলেছিলেন, যেখানে তার হাড় এবং আংটির ছাপ স্পষ্ট দেখা যায়। এটি ছিল ইতিহাসের প্রথম এক্স-রে চিত্র।

রন্টজেনের আবিষ্কার দ্রুতই সারা বিশ্বে জনপ্রিয় হয়। ১৯০১ সালে তিনি পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান। রন্টজেনের এই আবিষ্কার চিকিৎসা বিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটায় এবং তা আজও মানবকল্যাণে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এক্স-রে পরীক্ষার প্রকারভেদ
এক্স-রে বিভিন্ন ধরনের হতে পারে এবং এগুলো নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণের জন্য ব্যবহৃত হয়। সাধারণত ব্যবহৃত এক্স-রের কয়েকটি প্রধান ধরন হলো:
- প্লেইন এক্স-রে: সাধারণ চিত্রায়নের জন্য ব্যবহৃত হয়, যেমন হাড় ভাঙা বা ফুসফুসের সংক্রমণ পরীক্ষা।
- ডেন্টাল এক্স-রে: দাঁতের অবস্থা এবং মাড়ির সমস্যাগুলো নির্ণয়ের জন্য ব্যবহৃত হয়।
- মেমোগ্রাম: স্তন ক্যান্সার নির্ণয়ের জন্য ব্যবহৃত একটি বিশেষ এক্স-রে পদ্ধতি।
- ফ্লুরোস্কপি: এটি চলমান ছবি তৈরি করে এবং সাধারণত হৃদযন্ত্র ও রক্তনালী পরীক্ষা করতে ব্যবহৃত হয়।
- সিটি স্ক্যান: উন্নত ৩ডি চিত্র তৈরি করতে একাধিক এক্স-রে রশ্মি ব্যবহার করে।
এক্স-রে ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা
এক্স-রে সাধারণত নিরাপদ হলেও এতে রেডিয়েশন ব্যবহৃত হয়, যা অতিরিক্ত মাত্রায় ক্ষতিকর হতে পারে। এক্স-রে ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:
- গর্ভাবস্থা: গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে এক্স-রে করার সময় অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করা হয়।
- শিশুদের জন্য: শিশুদের ক্ষেত্রে এক্স-রে কম মাত্রায় ব্যবহার করা হয়, কারণ তাদের শরীর রেডিয়েশনের প্রতি বেশি সংবেদনশীল।
- অপ্রয়োজনীয় স্ক্যান এড়ানো: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অপ্রয়োজনীয় এক্স-রে করা উচিত নয়।
এক্স-রে পরীক্ষার মাধ্যমে চিকিৎসকরা দ্রুত এবং নির্ভুল রোগ নির্ণয় করতে পারেন। এটি সাধারণত ব্যথাহীন এবং দ্রুত সম্পন্ন হয়। প্রাথমিকভাবে এক্স-রে রোগ নির্ণয়ের একটি অপরিহার্য পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহৃত হলেও, এখন এটি আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তির সাথে সমন্বিত হয়ে আরও উন্নত এবং কার্যকর হয়েছে। আজকের দিনে এক্স-রে শুধুমাত্র চিকিৎসা ক্ষেত্রে নয়, শিল্প এবং গবেষণা ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়। বিভিন্ন যন্ত্রাংশের গুণগত মান পরীক্ষা, বিমানবন্দরে নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং বিজ্ঞান গবেষণার বিভিন্ন ক্ষেত্রে এক্স-রের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।
এক্স-রে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। এটি রোগ নির্ণয়ে দ্রুত এবং নির্ভুল ফলাফল প্রদান করে, যা চিকিৎসা প্রক্রিয়াকে সহজ এবং কার্যকর করে তোলে। রেডিয়েশনের প্রতি সতর্কতা অবলম্বন করে এক্স-রে ব্যবহারের মাধ্যমে চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতি আরও ত্বরান্বিত হয়েছে। উইলহেলম কনরাড রন্টজেনের এই আবিষ্কার আজও মানবকল্যাণে অপরিসীম ভূমিকা পালন করছে।